[url=http://www.gulfup.com/?AomQ4i][img]http://www.gulfup.com/G.png[/img][/url]

শনিবার, ২১ জুলাই, ২০১২

ঐ বিষন্ন মুখে হাসি আমি ফোটাবো

 

ঐ বিষন্ন মুখে হাসি আমি ফোটাবো..
ঈশিতা প্রথমে বুঝতেই পারল না কি হচ্ছে । ওর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল । ও আসলে ভাবতেই পারে নি যে আমি এই রকম একটা কাজ করবো বা করতে পারি ।
যখন লিফটের দরজা দিয়ে বের হলাম পিছন ফিরে চাইলাম । এতো দিন পর এই প্রথম ওর চোখে আমি বাষন্নতার জায়গায় এক টুকরো বিশ্ময় দেখতে পেলাম । ঈশিতা এতোটাই বিশ্মিত হয়েছে যে হয়তো ও ভুলেই গেছে এই ফ্লোরেই ওকে নামতে হবে । আস্তে করে লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল । আমি আমার কেবিনে ঢুকে পরলাম ।
প্রথম যে দিন আমি এই অফিসে যোগদিই সেই দিনই ঈশিতার প্রতি আমি ইন্টারেস্টেড হয়ে উঠি । একনম্বর কারন হল আমার পোষ্টটা টা ঈশিতার আন্ডারে । ম্যানেজার সাহেব যখন আমাকে ঈশিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল তখন আমার মনে হল এই টুকু একটা পিচ্চি মেয়ের আন্ডারে আমি কাজ করবো ?
এই পিচ্চি মেয়েটা আমার বস ?
দ্বিতীয় কারনটা হল পিচ্চি হলেও মেয়েটা অসম্ভব গম্ভীর । প্রয়োজনের একটাও বেশি কথা বলে না । আমি ভেবে পেলাম না এই টুকু বয়েসে মেয়েটা এতো গম্ভীর্য পেলো কোথা থেকে ?
প্রথম দিনে এই কথাটাই কেবল আমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল । এমনটা কেন হবে !
আমার বস হওয়ার সুবাধে ঈশিতার সাথে আমার কথা বলার অনেক স্কোপই তৈরি হতে লাগল । কিন্তু ঈশিতা সেই আগের মতই । প্রয়োজনের একটাও বেশি কথা মেয়েটা বলে না । কয়দিন পরই এক কলিগের কাছ থেকে মেয়েটার এমন গাম্ভীর্যের কারন জানতে পারলাম । জানতে পেরে মোটামুটি একটা সক খেলাম ।
মেয়েটা বিবাহিত । ও মাই গড ! এটু টুকু পিচ্চি মেয়ে বিবাহিত । আরো জানতে পারলাম মেয়েটার খুব সুখী একটা সংসার ছিল ।
আগে সবার সাথে খুব মেলামেশা করত ।সবার সাথে কথা বলত , হাসতো । খুব প্রাণ চঞ্চল একটা মেয়ে ছিল । কিন্তু মাস ছয়েক আগে একটা দুর্ঘটনায় মেয়েটার স্বামীটা মারা যায় । তারপর থেকেই মেয়েটা এমন চুপচাপ হয়ে যায় । তারপর থেকেই মেয়েটার উপর আমার আকর্ষন আরো বেড়ে যায় ।
আমি উপায় খুজতে শুরু করলাম কিভাবে ঈশিতাকে আবার স্বাভাবিক করা যায় ! কিভাবে মেয়েটার মুখে হাসি ফোটানো যায় ! এসব ভাবতে ভাবতে একটা সময় আমি লক্ষ্য করলাম আমি সারাটা সময় কেবল ঈশিতার কথাই ভাবছি । যতক্ষন অফিসে থাকি ততক্ষন কেবল ওর আসেপাশে থাকতে ইচ্ছা করে । কোন না কোন কাজের বাহনায় আমি ঈশিতার কেবিনে যেতে লাগলাম । ওর সাথে একটু বাড়তি কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলাম । খুব যে বেশি লাভ হল তা বলব না , কিন্তু আমি নাছড়বান্দা । আমি চেষ্টা করতেই থাকলাম ।
কিন্তু সব ভাল কাজে বাধাতো আসবেই । কয়দিন আগে আমার হাতে আমার প্রমোশন লেটার এসে হাজির হল । তাতে বলা হয়েছে আমাকে সিনিয়র অফিসার পদে অধিস্থিত করা হয়েছে । তারমানে ঈশিতার সমান পদ । কিন্তু সমস্যা হল আমার আমার পোষ্টিং হল অন্য শাখায় ।
কিন্তু আমি ঈশিতাকে ছেড়ে কিভাবে যাবো ? মোটেই যাবো না । প্রমোশনের খ্যাতা পুড়ি আমি । লাগবে না আমার প্রমোশন । চুপচাপ বসের কেবিনে গেলাম । গিয়ে বললাম আমার প্রোমোশনের দরকার নাই । আমাকে যেন আগের পদেই রাখা হয় ।
বস শুধু অবাক হল না যেন আকাশ থেকে পড়ল তাও আবার সাত আসমানের উপর থেকে । কিন্তু আমার কাজ করার রেকর্ড মোটামুটি ভাল । তাই বস আমার কথা রাখলেন ।
সেই দিনই ঈশিতা আমার সাথে প্রথম কথা বলল । মানে কাজের বাইরে কোন কথা বলল । ওর কেবিনে গেছিলাম একটা কাজে । কাজ শেষে কেবিন ছেড়ে যাবো ঠিক এমন সময় ও পিছন থেকে ডাকল ।
-অপু সাহেব একটু শুনুন ।
-জ্বি বলুন ?
-আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি ? যদি কিছু না মনে করেন ।
-হ্যা অবশ্যই ।
ঈশিতা খানিকটা ইতস্তত করে বলল
-আচ্ছা আপনি প্রমোশনটা রিফিউজ কেন করলেন ?
আমি হাসলাম । বললাম
-আসলে সাভারে পোষ্টিং দিচ্ছিল তো তাই ইচ্ছা করলো না যেতে ।
ঈশিতা আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল । কি বিষন্ন সেই দৃষ্টি ! তারপর বলল
-আপনি যেটা চাচ্ছেন সেটা কখনও সম্ভব না । কখনও না ।
আরে মেয়েটা বলে কি ? তার মানে আমার আচরন ওকে কিছুটা ভাবিয়েছে । ও কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছে । আমি একটু হাসলাম । বললাম
-যদি লক্ষ্য থাকে অটুত দেখা হবে বিজয়ে ।
-মানে ?
-কোন মানে নেই । আমি আসি । আমি আবার হাসলাম ।
কেবিন থেকে বেরনোর আগে আমি আবার ঘুরে দাড়ালাম । বললাম
-ঈশিতা !
ঈশিতা মুখ তুলে চাইল ।
-আমি আপনার মুখে আমি হাসি ফোটাবোই ।
আর দাড়ালাম না । ঘুরে চলে এলাম ।
তারপর আমি ওর আশেপালে থাকি । প্রত্যেকটা কাজে ওকে জানান দেওয়ার চেষ্টা করি যে আমি আছি তোমার আসেপাশে । যতক্ষন না তুমি হাসছো ততক্ষন আমি নড়ছি না । কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না । ঈশিতা ঠিক আগের মতই রয়ে গেল । আগের মতই চুপচাপ আগের মতই বিষন্ন ।
তবে একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করতাম আমার উপস্থিতিতে ওর চেহারার মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন আনতো । তবে এটা সিওর বুঝতাম না যে ওটা অস্বস্তি ছিল নাকি আনন্দ । এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল । ঈশিতার সাথে দেখা হচ্ছিল কথা হচ্ছিল কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না । মেয়েটার বিষন্ন চেহারায় কিছুতেই পরিবর্তন আনতে পারছিলাম না ।
তারপর আজকের দিন এল । অফিসে আসতে আজ একটু দেরি হয়ে গেছিল । লিফটের সামনে এসে দেখি ঈশিতা দাড়িয়ে আছে । আমাকে দেখেও যেন দেখল না ।
আরে এটা কেমন কথা হল ? আমরা একসাথে কাজ করি দুএকটা কথাতো বলা যায় !
আমি খানিকটা হেসে বলল
- গুড মর্নিং
ও যথারীতি আমার দিকে না তাকিয়েই বলল
-গুড মর্নিং ।
লিফট চলে এল । মাত্র দুজনই । আর কেউ উঠল না । আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম যেন আর কেউ না ওঠে । দরজা বন্ধ হতেই ঈশিতাকে বললাম
-মানুষের সাথে এরকম ব্যবহার করা কিন্তু ঠিক না ।
-আপনি কি আমাকে বলছেন ?
-না আপনাকে কেন বলব ? আমার পাশের ফ্লাটে একটা পেট মোটা লোক থাকে সে সবসময় মানুষকে খুব হার্ট করে । তাকে বললাম কথাটা ।
ঈশিতা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে । আমি আবার বললাম
-এটা কি ধরনের প্রশ্ন হল ? অবশ্যই আমি আপনাকেই বলতেছি ।
-অপু সাহেব আমি এমনই ।
-কিন্তু আপনিতো এমনটা ছিলেন না ।
-কেমন ছিলাম এটা প্রশ্ন না এখন কেমন আছি এটাই প্রশ্ন ।
-আমার খুব খারাপ লাগে আপনার এরকমটা দেখে । আপনি কি পরিবর্তন হতে পারেন না ? নতুন করে জীবন শুরু করা কি যায় না ?
এবার ঈশিতা খানিকটা কঠিন গলায় বলল
-দেখুন আপনার কি ভাল লাগে না লাগে তাতে আমার কিছু যায় আসে না ঠিক আছে । আপনার সাথে কথা বলতে ভাল লাগছে না ।
কি ? মেজাজটা খানিকটা খারাপ হল । এই মেয়েটার কথা ভেবেই আমার সারাটা দিন যায় । আমার কেবল এই চেষ্টা থাকে কিভাবে এর মুখে হাসি ফোটাবো আর এই মেয়ে কিনা আমাকে গোনার মধ্যেই নেই নেয় ।
আমি কি জলের টানে ভেসে এসেছি । ঈশিতার মুখোমুখি গিয়ে দাড়াই । ও কিছু বলার আগেই ওর হাত দুটো চেপে ধরলাম । বললাম
-এই মেয়ে তোমার প্রবলেম কি ? আমার সাথে এমন কেন কর তুমি ?
আমার তখন রাগে শরীর কাঁপছে । নিজের মধ্যে নেই আমি । কি করছি কি বলছি কিছুই ঠিক নেই । তোমাকে আজ আমি মজা দেখাচ্ছি । বলেই ওকে চেপে ধরে চুম খেলাম ওর ঠোটে । বেশ লম্বা করেই ।
যখন হুশ হল ততক্ষনে লিফটের দরজা খুলে গেছে । ভাগ্য ভাল যে দরজার বাইরে কেউ ছিল না । আমি লিফট থেকে বের হয়ে এলাম । যথন পিছনে ফিরে তাকালাম লিফটের দরজাটা বন্ধ হচ্ছে । আর প্রথম বারের মত ঈশিতার চেহারায় বিষন্নতার জায়গায় আমি বিশ্ময় দেখতে পেলাম ।

কাজ টাজ করছিলাম । কিন্তু মনটা ঐ দিকেই পড়ে ছিল । একটু দুষ্চিন্তাও হচ্ছিল । না জানি ঈশিতা কি একশন নেয় । তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল ও কাউকে কিছু বলবে না । সারা দিনে একবারও ঈশিতার কেবিনে যাই নি ।
পরদিনও গেলাম না । কিন্তু পরদিন অফিস ছুটি হবার একটু আগে পিয়ন এসে একটা চিরকুট দিয়ে গেল । বলল ঈশিতা দিয়েছে । চিরকুট টা খুলে দেখলাম
অপেক্ষা করবেন প্লিজ ।

প্রথমে ভেবেছিলাম ঈশিতা হয়তো খুব ঝাড়ি মারবে । কিন্তু ওকে বেশ নরম দেখাল । আর সব থেকে বড় কথা হল ওর চেহারায় বিষন্ন ভাবটা তুলনা মূলক ভাবে কম ।
অফিসের সামনের একটা রেস্টুরেন্টে বসলাম আমরা । সত্যি বলছি আজ ঈশিতাকে দেখতে খানিকটা অন্য রকম লাগছে । আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আজ ঈশিতা হাসবে । আমার এতো দিনের চেষ্টা আজ সফল হবে ।
আমি আগে মুখ খুললাম, বললাম
-তোমাকে সুন্দর লাগছে ।
একেবারে আপনি থেকে তুমি । হাহাহা !!!
-এই কথা কেন বললেন ?
-কারন আজ তোমার চেহারায় বিষন্নতাটা কম । একটু আছে তবে আমার বিশ্বাস এখন আমার সাথে কথা বলার পর তাও থাকবে না ।
-আপনার বিশ্বাসে সমস্যা আছে । আপনি যা ভাবছেন তার কিছুই হবে না । আমি শুধু একটা কথা জানতে আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছি ।
-তাও তো নিয়ে এসেছ ! বল তোমার কথা ।
-আপনি কেন করলেন কাজটা ?
-কোন কাজটা বল তো ?
-শুনুন ঢং করবেন না । আপনি খুব ভাল করেই জানেন কোন কাজটা !
সরাসরি ঈশিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম
-তুমি কি শুধু এই কথাটা জানার জন্যই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ ?
ঈশিতা চট করেই উত্তর দিল না । কিছুক্ষন পর মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিল যে ওর আরো কিছু বলার আছে ।
-আগে তোমার কথা শুনি ।
খানিকটা সময় চুপ করে থেকে ঈশিতা বলল
-আপনি যে কাজটা করেছেন ঠিক এমনই একটা ঘটনা আমার জীবনে এর আগেও ঘটেছে ।
-মানে ?
-মানে সজিব । আমার হাজবেন্ড । বিয়ের আগে ও আমাদের পাশে ফ্লাটেই থাকতো । একদিন লিফটের মধ্যে আপনার মতই কথা বলতে বলতে আমাকে চেপে ধরে কিস করেছিল । ওর খুব রাগ করার চেষ্টা করেছিলাম । কিন্তু পারি নি । ঐ ছেলেটা কিভাবে যে আমার মনটা নিজের করে নিল বুঝতেই পারলাম না । আমার সব কিছুই যেন ওর ছিল । আমার সব আবেগ অনুভূতি ভালবাসা সব কিছুই ওর ছিল । ও চলে যাবার পর ওর সাথে সাথে এ সব কিছুও হারিয়ে গিয়েছিল । কিন্তু ...
-কিন্তু কি ?
-আজ আমি আপনার উপর রাগ করতে পারছি না । আপনি যে কাজটা করেছেন অভিয়াসলি আপনার উপর আমার রাগ করা উচিত্ কিন্তু আমি রাগ করতে পারছি না । আমি কাল সারাটা রাত কেবল আপনার কথা ভেবেছি । আপনি এতো দিন যে আমার পিছনে লেঘেছিলেন তার প্রতিটা কথা আমি কাল রাতে ভেবেছি । খানিকটা অবাক হয়েছে ।
তারপর একটু ইতস্তত করে বলল
-খানিকটা খুশিও হয়েছি ।
খুশি ?
ওমাইগড !
এই মেয়েটা কি বলছে !
এই সুযোগ । আমার যা বলার তা বলেই ফেলতে হবে ।
আমি ওর হাত ধরলাম । ঈশিতা অন্য দিকে তাকিয়ে থাকল । আমি বললাম
-আমার চেহারাটা তো এতোটা খারাপ না যে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে । জানো কলেজ লাইফে আমার পিছনে কত গুলো মেয়ে ঘুরতো !
ঈশিতা মুখে একটু যেন হাসির আভা দেথতে পেলাম । তবে ওর চেহারার বিষন্নতা পুরোপুরি কেটে গেছে ।
ওকে বললাম
-জীবনটাকে সব সময় সচল রাখতে হয় । এটাই জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট । কিন্তু তুমি তোমার জীবনটাকে থামিয়ে রেখেছ । একটা জায়গায় আটকে রেখেছ । এতে যেমন তুমি কষ্ট পাচ্ছ তোমার আসেপাশের মানুষ গুলোও কষ্ট পাচ্ছে । এটা কি ঠিক হচ্ছে বল ?
ঈশিতা আবার মাথা নাড়াল ।
-তাহলে কেন এমন করছ ? তোমাকে একটা গল্প বলি । একটা ছেলে একটা মেয়ে অনেক ভালবাসত । কিন্তু একদিন মেয়েটা মারা যায় । এতে ছেলেটা খুব বেশি কষ্ট পায় । সারা দিন কান্না কাটি করে মন খারাপ করে থাকে । একদিন ছেলেটা মেয়েটাকে স্বপ্নে দেখলো । স্বপ্নে দেখলো যে মেয়েটার চারিপাশে খুব চমত্কার পরিবেশ । গাছগাছালি রংবেরংয়ের জিনিস পত্রে ভরপুর । কিন্তু কেবল মেয়েটা যেখানে আছে তার আসেপাশে সবকিছু কেমন যেন প্রানহীন বিবর্ণ । ছেলেটা আরো লক্ষ্য করল আসেপাশের সবার ঘরে আলো জ্বললেও মেয়েটার ঘরে কোন আলো জ্বলছে না ।
ছেলেটা জানতে চাইল তোমার এমন কেন অবস্থা ।
মেয়েটা বলল আমার এ অবস্থার জন্য তুমি দায়ী ।
ছেলেটা খুব অবাক হল । বলল কেন ? মেয়েটা বলল তুমি যে আমার জন্য সারাদিন কান্নাকাটি কর তোমার সেই চোখের জল এসে আমার ঘরের মোমবাতি নিভিয়ে দিয়ে যায় । এই জন্য আমাকে অন্ধকারে থাকতে হয় । আর তুমি যে মন খারাপ করে থাকো তোমার সেই বিষন্নতা আমার চারিপাশটাকে প্রান হীন করে তোলে ।
ঈশিতা বলল
-এ গল্প আপনি কোথা থেকে শুনেছেন ?
-কোথা থেকে শুনেছি ইম্পর্টেন্ট না । মুল থিমটা ইম্পর্টেন্ট । তুমি কিন্তু তোমার ভালবাসার মানুষটাকেও কষ্ট দিচ্ছ । যে ঐ উপরে আছে তোমাকে দেখছে তাকে কষ্ট দিচ্ছ আর যে তোমার কাছে আছে তাকেও ।
ঈশিতা কোন কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল ।
-আচ্ছা আমি তাহলে কালকেই সাভারে পোষ্টিং নিয়ে নিচ্ছি । ঠিক আছে ?
ঈশিতা এবার অবাক হল ।
-কেন ?
-আরে আশ্চর্য আমার বউ যদি আমার উপরে জব করে তাহলে লোকে কি বলবে ? ঘরেও আমি বউয়ের কথা শুনবো আবার অফিসেও তার কথা শুনবো তাহলে কিভাবে হয় ?
ঈশিতা আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল ।
এই প্রথম ওকে আমি হাসতে দেখলাম । হাসলে ওকে কি চমত্কারই না লাগে । হাসতে হাসতেই বলল
-আমার বয়েই গেছে তোমাকে বিয়ে করতে ! কত কিছু ভাবো না তুমি । ঠিক মত কথা শুরু করতে পারলাম না উনি বিয়ে পর্যন্ত চলে গেছে । বসে বসে স্বপ্নই দেখো তুমি ।
আমি কোন কথাই বলি না । কেবল ওর হাসি ভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকি । মনে হয় আমি জয়ী হয়েছি ।

আমার জন্মদিন........


সালাম বাবা -মা.....


আজ স্বর করি সেই মানুষ জন দের,যাদের জন্য দেখতে পেলাম আমি পৃথিবীর আলো....

কি আশ্চার্য এই মেয়ে গুলো !!!



কি আশ্চার্য এই মেয়ে গুলো !!!

 

একটু আগেই বাস থেকে নেমে পড়লাম । ঈশিতার পেছন পেছন । একটু অবশ্য হাটতে হবে । হোক !
ঈশিতা আমার সামনে সামনে হাটছিল । একবারও পিছন ফিরেও তাকাচ্ছে না । এমন একটা ভাব যেন আমাকে ও একদমই চেনে না । পিছন থেকে ওকে ডাক দিলাম ।
মনে ভয় ছিল ও হয়তো শুনেও না শোনার ভান করে চলে যাবে । দাড়াবে না । কিন্তু না । দাড়াল ও । আমি আস্তে আস্তে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম । কারনটা আজ জিজ্ঞেস করতে হবে ।

ঈশিতা বোধহয় আমার উপর কোন কারনে রাগ করেছে । আমাকে কেমন জানি এড়িয়ে চলছে । অবশ্য ওর সাথে আমার খুব যে খুব অন্তরঙ্গ তা কিন্তু নয় । একই অফিসে চাকরি করার সুবাদে ওর সাথে আমার পরিচয় । টুকটাক কথাবার্তা একসাথে আসা যাওয়া করা এই । কিন্তু কদিন থেকে লক্ষ্য করছি সেই টুকুও ও বন্ধ করে দিয়েছে ।
এই জিনিসটা আমাকে খানিকটা কষ্ট দিচ্ছে । ঈশিতা কে আমি বেশ পছন্দ করি । দেখতে সুন্দর কথাবার্তাও সুন্দর । ওর সব কিছুই ভাল । পছন্দ হওয়ার মতই মেয়ে ও । কিন্তু সবসময় ও আমার সাথে খানিকটা দুরুত্ব রেখেই চলত । শুধু আমার সাথে না । সবার সাথেই । কারো সাথে খুব বেশি গভীর ভাবে মিশত না ও ।
আর কদিন থেকে যেন আরো চুপচাপ হয়ে গেছে । আমার সাথে কথা বলছে না একদমই ।
কারন টা কি ? আমার কোন আচরনে কি ও কষ্ট পেল ? বুঝতে পারছি না কিছুতেই । যাই হোক আজ জিজ্ঞেস করবো ।
আমরা মোটামুটি একই জায়গায় থাকি । এক স্টপেজ আগে পিছে । আগে আসার সময় আমরা প্রায়ইএকসাথে ফিরতাম অফিস থেকে । পাশাপাশি বাসেয় সিটে অথবা সিএনজিতে । ওর সাথে টুকটাক কথা বলা চলত ।
কি চমৎকার সময় কাটতো তখন !
একদিন অফিস থেকে আসার পথে বাস নষ্ট হয়ে গেল । সবাই বাস থেকে নেমে যখন অন্য বাসের জন্য ওয়েট করছে তখন ঈশিতা বলল
-আসুন রিক্সা নেই ।
আমি এই কথাটা শোনার জন্যই যেন অপেক্ষা করছিলাম । জীবনের সব থেকে সুন্দর রিক্সা ভ্রমন ছিল সেটা ।
এভাবেই দিন গুলো কেটে যাচ্ছিল সুন্দর ভাবে । কিন্তু কি হল ঠিক বুঝলাম না !

ওর সামনে গিয়ে দাড়ালাম ।
-হাই ।
ঈশিতা কোন উত্তর দিল না । আমি আবার বললাম
-অফিস কেমন ছিল আজ ?
-আপনি কি এই কথা বলার জন্য আমাকে ডাকলেন ?
-না মানে !
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না কথাটা কিভাবে তুলবো ।
-অপু সাহেব সারাদিন অফিস করে আমি বেশ ক্লান্ত । আমি এখন বাসায় যাবো ।
ওর গলায় কেমন জানি একটা কাঠিন্য ছিল । আমার সাথে কথা বলতে সে রাজি না ।
-আচ্ছা আপনি কি কোন কারনে আমার উপর রাগ করেছেন ?
সরাসরি জিজ্ঞেস করেই ফেললাম ।
-আপনার কেন মনে হচ্ছে যে আমি আপনার উপর রাগ করেছি ?
-না মানে আপনি .....
কি যে বলবো বুঝতে পারলাম না ।
-দেখুন অপু সাহেব রাগ বা অভিমান কেবল কাছের মানুষ গুলোর উপর করা যায় । আপনি আমার এমন কোন কাছের মানুষ না যে আপনার উপর আমি রাগ করবো !
আমার মনটা একটু খারাপই হল । এতো কঠিন করে না বললেও তো চলত ।
-আশা করি আপনি আপনার জবাব পেয়েছেন ।
ঈশিতা আর দাড়াল না । আমি দাড়িয়ে রইলাম ।
ওর কথায় স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে আমার উপর ও রেগে আছে । কিন্তু আমি এমন কি করলাম ? কিছুই মনে পড়ছে না ।

মনটা খারাপ নিয়েই বাসায় ফিরলাম । রাতে বিছানায় শুয়েও কেন জানি ঘুম এল না । কেবলই ঈশিতার কথা মনে হতে লাগল । আর মনে হয় ওর সাথে রিক্সায় চড়া হবে না । মাঝে মাঝে যে বাসে ও আমার পাশে এসে বসত টুকটাক কথা বলত সেটা বোধহয় আর হবে না ।
আসলে মেয়েগুলো এতো জটিল কেন হয় ? এদের বোঝা বড় মুশকিল । কি করেছি সোজাসুজি বললেই হয় !
ঈশিতা আসলেই যেন কেমন ! অফিসের সবার সাথেই ও দুরুত্ব রেখে চলে । তবুও সবার থেকে আমার সাথে একটু আধটু কথা বলত । তাও বোধহয় বন্ধ ।
ওর আচরন বোঝা আসলেই আমার কর্ম নয় ।
তিনচার দিন আগে আমাদের একটা প্রোগ্রাম ছিল । অফিসের কাছেই । বস বলল সবাই রিক্সা নিয়ে রওনা হয়ে যান । দেখি সবাই শেয়ার করে যাচ্ছে । আমার মনে সেদিন কার কথা মনে পড়ল ।
আশা করলাম ও হয়তো আমার সাথেই যেতে চাইবে । অনেকক্ষন অপেক্ষা করলাম কিন্তু ঈশিতা এল না । এমন কি একবার নিজে গিয়ে জিজ্ঞেসও করলাম ।
-যাবেন না ?
-এই তো যাবো ।
একবার তো বলতে পারতো আমার জন্য একটু দাড়ান । একসাথে যাই । কিন্তু হায় !
তবুও দাড়িয়ে ছিলাম । কিন্তু বেশিক্ষন দাড়িয়ে থাকা গেল না ।
ইরিন এসে বলল
-কি ব্যাপার অপু ভাই এখনও যান নি ? যাক ভালই হল । চলুন আপনার সাথে যাওয়া যাক ।
ইরিন মেয়েটা কি স্বাভাবিক ভাবেই বলল !
ঈশিতাও তো বলতে পারতো । ইরিনের সাথেই গেলাম । ঈশিতার সাথে আর রিক্সায় ওঠা হল না । বোধহয় আর কোন দিন হবেও না ।
পরদিন অফিস গেলাম মন খারাপ নিয়েই । আগে কোন না কোন অজুহাতে ঈশিতার ডেস্কে যেতাম দুএক বার । আজ আর গেলাম না । যদিও কাজে মন বসছিল না তবুও মুখ বুজে কাজই করতে লাগলাম ।
আমি কাজ করছিলাম ঠিক এমন সময় ঈশিতা ফোন দিল ।
-ব্যস্ত ?
প্রথমে ভেবেছিলাম রাগ দেখাবো কিন্তু পারলাম না । বললাম
-এইতো কাজ করছি আর কি ? তেমন ব্যস্ত না ।
-একটু ছতলায় আসবেন ?
আমি খানিকটা অবাক হলাম । কালকের ঈশিতা আর আজকের ঈশিতা কেমন ভিন্ন মনে হল ।
-আচ্ছা আসছি ।
আমাদের এই বিল্ডিংটায় প্রায় ১0/১২ অফিস । আর ছতলায় হল ক্যান্টিন । সব অফিসের এই একটা কমন ক্যান্টিন । তাই মোটামুটি ভিড় থাকে সব সময় । তবে তুলনা মুলক ভাবে এই সময়টাতে কম থাকে লোকজন । অফিসের পিক আওয়ার তো !
ঈশিতাকে দেখলাম একদম কোনার একটা টেবিলে বসে আছে মাথা নিচু করে । আমি সামনে গিয়ে বসতেই মাথা তুলে তাকাল ।
ঈশিতার দিকে তাকিয়ে কেমন অবাক হলাম । ওর চোখ দুটো কেমন জানি ফোলাফোলা । বোধহয় কেঁদে কোন কারনে ।
-আমি বললাম কি হয়েছে ?
ও কোন কথা ধা বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল ।
-আরে বলতে হবে তো কি হয়েছে । তা না হলে বুঝবো কিভাবে ?
অনেকক্ষন পর ঈশিতা বলল
-আই এম সরি !
-সরি ? কেন ?
-কালকে আমি আপনার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি ।
এই বলে ঈশিতা আবারও মাথা নিচু করলো । খারাপ ব্যবহার তো করেছে । কিন্তু এই কথা তো আর মুখে ওর বলা যায় না । আমি বললাম
-না ঠিক আছে সমস্যা নাই ।
-না ঠিক নাই ।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম ঈশিতার চোখ দিয়ে পানি পরছে । আশ্চর্য পানি পরছে কেন ?
-আপনি কাঁদছেন কেন ? প্লিজ কাঁদবেন না । আমি কিছু মনে করি নি । সত্যি বলছি কিছু মনে করি নি ।
ঈশিতা বলল
-আসলে আমি খুব রেগে ছিলাম আপনার উপর । এই জন্য খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি । কিন্তু বাসায় গিয়ে এতো খারাপ লাগছিল । সারা রাত আমি ঘুমাতে পারি নি ।
ঈশিতার বেশ সময় লাগল শান্ত হতে । আমি ওকে সামলে নেওয়ার সময় দিলাম । পুরোপুরি শান্ত হলে আমি ওকে বললাম
-একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ?
-করুন ।
-আপনি আমার উপর কেন রাগ করেছেন বলেন তো ?
ঈশিতা কোন কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল । আমি আবার বললাম
-আপনি রাগ করেছেন বুঝতে পারছিলাম কিন্তু কারনটা কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না ।
একটু চুপ করে থেকে ঈশিতা বলল
-আপনি সেদিন ইরিনের সাথে রিক্সায় কেন উঠলেন ?
-মানে ?
কি বলছে এই মেয়ে ! আমি ইরিনেয় সাথে রিক্সায় উঠলে ও কেন রাগ করবে ?
কেন রাগ করবে ? আমি ঈশিতার দিকে তাকিয়ে থাকলাম ।
আচ্ছা ! এইবার বুঝলাম । ইরিনের সাথে রিক্সায় উঠলে ঈশিতা কেন রাগ করবে আমি বুঝতে পারলাম ।
আসলেই এই মেয়েদের মন বোঝা কত কঠিন ! ঈশিতার আচরন এমন ছিল আমি কোন দিন ভাবতেই পারি নি ও এমনটা চাইবে । আমি বললাম
-আমি তো আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিল । তখন নিশ্চই আপনার বলা উচিৎ ছিল ।
ঈশিতা এবারও কোন কথা বলল না । কেবল আমার দিকে তাকিয়ে থাকল ।
-এই টুকু বললেই কিন্তু হয়ে যেত ! হটাৎ ঈশিতা বলল
-আপনাকে ইরিনের সাথে দেখে এতো রাগ হল । মনে হল .... মনে হল ...
-কি মনে হল ?
-জানি না কি মনে হল ! আপনি আর কখনও ইরিনের সাথে রিক্সায় উঠবেন না । কোন দিন না ।
আমি হেসে উঠলাম । বললাম
-তো কার সাথে উঠবো ? আপনার সাথে ?
আমি হাসতেই থাকি ।
-হাসছেন কেন ?
-তোমার ছেলেমানষী দেখে হাসছি ।
-কি ছেলেমানুষী করলাম ?
-কাল তুমি কি বলেছিলে মনে আছে ?
-কি ?
-বলেছিল কাছে মানুষের উপরই কেবল রাগ অভিমান করা যায় । আমি আজকে একটা কথা বলি ! তুমি যেমন করে আমাকে রিক্সায় উঠতে মানা করলে .... কেবল আপন মানুষ গুলোই ওভাবে বলতে পারে । এখন বল তুমি কি আমার কাছের মানুষ ?
ঈশিতা কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল । আমি হাসি মুখে বললাম
-চুপ করে থেকো না । বল ।
ঈশিতা চুপ করে থাকল । কেবল এক ভাবে আমার দিকে তাকিয় থেকল ।
কি আশ্চার্য এই মেয়ে গুলো । মেয়েগুলো মুখে এক কথা আর চোখ বলছে আর এক কথা । একটু মুখ ফুটে বললে কি হয় ? এমন কি ক্ষতি হয় ?

খোদার বরকত যাহাতে রয়েছে

খোদার বরকত যাহাতে রয়েছে
খোদার বরকত যাহাতে রয়েছে
নাই নাই শেষ তাহার নাই,
খোদার বরকতময় গুণগান
দিবানিশি গেয়ে যাই॥


লোকে ভাবে দিলে যাকাত
সম্পদ তার হবে নিপাত॥


এ যে ভুল ধারণা
লোকে বোঝে না ভাই॥


খোদার উপর ভরসা রেখে খাঁটি দিলে
কাজের শুরুতে যে বিসমিল্লাহ বলে॥
জানি খোদার অশেষ
বরকত-ই তো পাবে সেই॥


যে করবে দান খোদার পথে
খোদার দেয়া সম্পদ হতে॥
হবে না তার ভরা ডুবি,
আরো ভরবে গোলা ভাই॥

"তুমি বল" !! "না তুমি বল" !!

 

"তুমি বল" !! "না তুমি বল" !!

-এই কি করছ ?
-কিছু করছ না ।
-ডিস্টার্ব করলাম না তো?
- নাহ । সমস্যা নাই বল ।
তন্নী একটু চুপ করে থাকল । তারপর বলল
-বিকালে কি তুমি ফ্রী আছো ?
-কেন বল তো ?
আহা! প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন কর কেন ? বল না বিকালে তোমার কোন কাজ আছে কি না ?
আমি কিছুক্ষন ভাবলাম । তারপর বললাম
-নাহ । কোন কাজ নাই । বল কি বলবা ?
তন্নী বলল
-আজকে বিকালটা কি আমাকে দেওয়া যায় ?
-মানে ?
-মানে আমার সাথে বিকাল বেলা একটু দেখা করবা ?
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না তন্নী ঠিক কি বলতে চাইছে । বললাম
-দেখো সপিংটপিংয়ে যেতে পারবো না কিন্তু ।
-সপিংয়ে যেতে হবে না । তোমাকে ট্রিট দিবো ।
-খাওয়াবা ?
-হুম ।
-কোন স্পেশাল কারন ?
কারন তো আছে ।
-আমাকে একা খাওয়াবা ?
-হুম ।
আমি বললাম
-এই সুযোগতো আমি কখনও মিস করি না । বল কি খাওয়াবা ?
-তুমি যা খেতে চাও !
-দেখো কিন্তু ।
-আচ্ছা বাবা দেখবো ।
-ওকে দেন , সি ইউ এট ফাইফ পিএম ।
- সি ইউ । তন্নী ফোন রেখে দিল ।
ফোন রাখার পর মনে হল তন্নী হঠাত্ খাওয়াতে চাচ্ছে কেন ? অবশ্য তন্নী এমনিতেই প্রায়ই খাওয়ায় আমাদের । কিন্তু আজ আমাকে স্পেশাল ভাবে খাওয়াচ্ছে ।
আজ কেই বলবে নাকি ? কে জানে ?

তন্নী মেয়েটাকে আমি আগে মোটেই পছন্দ করতাম না । ওর পোষাক ওর কথা বার্তা ওর আচরন কোন কিছুই আমার ভাল লাগতো না । বড় লোকের মেয়েতো সব কাজে একটু বেশি বেশি । আর এতো ঢং , দেখলেই মেজাজটা খারাপ হয়ে যেত । তাই পারত পক্ষে আমি তন্নীকে এড়িয়ে চলতাম ।
তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে যে তন্নী দেখতে খুব সুন্দর ছিল । তাই আমাদের ক্লাসের ছেলেগুলা সব হ্যাংলার মত ওর আসেপাশে ঘুড়ঘুড় করতো । আমার বন্ধুরাও ছিল । অস্বীকার করবো না যে ওর চেহারা আমার ভাল লাগতো না । কিন্তু যখন ভার্সিটিতে আসতো এক বস্তা মেকআপ আর পারফিউন মেখে আসতো । আর কথা বলত এমন ঢং করে বিরক্তিতে মন ভরে উঠতো । তাই ওর আসেপাশে আমি ঘেসতাম না ।
কিন্তু ভাবতেও কত অবাক লাগে এই মেয়েটার সাথে এখন আমার কত ভাব । অবশ্য ওর সাথে মেলামেশাটা খুব বেশি দিনের নয় । কয়েক মাস আগে আমার ইউনিভার্সিটিতে রিসার্স মোথোডোলজি নিয়ে একটা ওয়ার্ক সপ হয়েছিল । কিছু ভলানটিয়ারের দরকার ছিল । তা কি মনে করে নাম লেখালাম । ওয়ার্কসপে এসে দেখি আমাদের ক্লাস থেকে পনের জনের মত ছেলে মেয়ে এসেছে । তাদের মধ্যে তন্নীও ছিল । ওকে দেখে একটু অবাকই হলাম । এই রকম কাজেও ওর ইন্টারেস্ট আছে ?
যাক ভাল । ওয়ার্কসপের সাতটা দিন কাটল বেশ ভালই । নতুন একটা অভিজ্ঞতা হল । হাসি তামাশা আড্ডাও হল খুব । এ কয়টা দিনে আমার কেন জানি মনে হল তন্নীকে আমি যেমনটা মনে করেছিলাম ও হয়তো তেমনটা না ।
কিন্তু তবুও ওর কাছ থেকে একটু দুরে দুরেই থাকলাম । বড় লোকের মেয়ে কখন কি মনে হয় বোঝা মুশকিল । কাছে না যাওয়াই ভাল । ওয়ার্কসপের শেষ দিনে আমরা সবাই মিলে আড্ডা মারছিলাম এমন সময় আড্ডার মাঝখানে তন্নী উঠে দাড়াল । সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল
-এই কয়দিনে তোমাদের সাথে আমার দারুন সময় কেটেছে । কাল আমার জন্য একটা বিশেষ দিন । তোমাদের সবাইকে আমি দাওয়াত করলাম । তোমরা সবাই অবশ্য অবশ্যই আসবে ।
ঠিক হল পরদিন বিকালে সবাই স্টার কাবাবে মিলিত হবে । তন্নী সবাই খুব ভাল করে বলল আসার জন্য । আমাকেও বলল এবং বেশ আন্তরিক ভাবেই বলল ।
কিন্তু আমি ঠিক করে রেখেছিলাম যে যাবো না । আর আমার এ রকম পার্টিফার্টি ভাল লাগে না । কিন্তু ব্যপারটা যত সহজ ভেবেছিলাম তত সহজ হল না । তন্নীর ফোন এল পরদিন দুপুর বেলা । রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে তন্নী বলল
-তুমি আসছো তো ? সবাইকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি । কেবল তুমি বাকি ছিলে । পাঁচ টার মধ্যে চলে এসো কেমন !
-ইয়ে মানে আমার হয়তো আশা হবে না ।
তন্নী কিছুক্ষন কোন কথা বলল না । আমি আবার বললাম
-আসলে আমার একটা কাজবেঁধে গেছেতো ।
তন্নী বলল
-আমি জানতাম তুমি এমন কিছু একটা বলবে ?
আরো কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল
-আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করবো তোমাকে ?
-বল ।
-তুমি আমাকে পছন্দ কর না কেন বলতো ? শুধু এবার না আমি প্রত্যেক বার দেখেছি তুমি সব সময় আমাকে কেমন যেন একটা ইগনোর কর । কেন এমন টা কর ? আমার জানা মতে আমি কোন দিন তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করি নি । তাহলে কেন এমনটা কর ?
একটানা কথা বলে তন্নী চুপ করলো । আসলে ও যা বলল তা মোটামুটি ঠিক । ওকে ইগনোর যে কেন করি তার কোন সুনির্দিষ্ট কারন আমার নিজেরও জানা নাই । তাহলে কেন করি ?
-আসলে আমি ....
-তোমাকে কোন কৈফত দিতে হবে না । কৈফত চাওয়ার অধিকার আমার নেই । কিন্তু এই আমি খুব আশা নিয়ে তোমাকে দাওয়াত করেছিল । আমার মনে হয়েছিল যে এবার হয়তো তুমি আসবে ।
তন্নীর গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছিল যেন ও কাঁদছে । কিংবা এখনই কেঁদে ফেলবে । ও আর কথা বলল না । ফোন রেখে দিল ।
একটা অপরাধ বোধে সারাটা মন কেমন যেন বিষাদ হয়ে রইল । বারবার মনে হতে লাগল যে কিছু নিশ্চয় আমি ঠিক করছি না ।
পরদিন সকাল বেলা ভার্সিটি তে গিয়ে আর এক কাহিনী শুনলাম । কালকে তন্নীর জন্মদিন ছিল । আর কালকের পার্টি ও ক্যান্সেল করে দিয়েছে কেবল আমি যাই নি বলে ।
আমি বড় আশ্চর্য হলাম । এমনতো হবার কথা না । আর আমি এমন কোন ইম্পর্টেন্ট মানুষ না যে আমার না আশাতে পুরো পার্টি হবে না । তন্নীর এক বান্ধবীর কাছে সব কিছু জানতে পারলাম । আসলে আমি যে ওকে পছন্দ করি না এটা ওকে পীড়া দিচ্ছিল । ও কেবল জানতে চাচ্ছিল ঠিক কি কারনে আমি ওকে ইগনোর করি ! আমার কাছাকাছি আসার জন্যই কেবল ওয়ার্ক সপে গেছিল । ও কেবল বোঝাতে চেয়েছিল যে সে খারাপ কেউ না । সবাই যেমন ওর সাথে মেশে আমি কেন তার সাথে মিশি না ।
ওর বান্ধবী আরো বলল যে ও কাল আসলেই অনেক কষ্ট পেয়েছে । কথা গুলো জানার পর আমার আসলেই খারাপ লাগতে লাগল । আসলেই মেয়েটার সাথে একটু অন্য রকম আচরন করা হয়ে গেছে । এখন এটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যে ওকে সরি বলা ।
খুজে বের করলাম ও কোথায় আছে । চার তলায় ক্লাস রুমের বাইরে ও বসে ছিল । আমি যেতেই আমার দিকে একটু তাকাল । ওর চোখ গুলো কেমন ফোলা ফোলা লাগল আমার কাছে । নিশ্চই কেঁদেছে । আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম ।
- হাই ! একটু হাসার চেষ্টা করলাম ।
তন্নী শুকনো গলায় বলল
-হাই!
- তুমি পুরো প্রোগ্রাম ক্যান্সিল কেন করলা ? এমন পাগলামো কেউ করে ? মানুষের কাজ থাকতে পারে না ?
-তুমি কি এই কথা বলার জন্য এখানে এসেছ ?
-আসলে আমি কাল কেন আসতে পারি না তা বলতে এসেছি ।
-কেন বলতে এসছো ? আমি কি তোমার কাছে কারনটা জানতে চেয়েছি ?
-না তা না । কিন্তু আমার কারনে কারো জন্ম দিনের প্রোগ্রাম নষ্ট হবে , এটা আমার কাছে ঠিক ভাল লাগছে না । নিজেকে কেমন অপরাধী অপরাধী লাগতাছে ।
তন্নী খানিকক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকল ।
-এই বোধটা আছে তোমার ? আচ্ছা একটা কথার উত্তর দিবে ?
-বল ।
-আমি কি কখনও তোমার সাথে থারাপ ব্যবহার করেছি ? অথবা তোমাকে উদ্দেশ্য করে খারাপ কিছু বলেছি ? না ।
-এ কথা কেন বলছ ?
-তাহলে এক্সেক্টলি কি কারনে তুমি আমাকে অপছন্দ কর বল !
-অপছন্দ করি কে বলল ?
-তোমাকে বলতে হবে কেন ? তোমার আচরনে স্পষ্টই বোঝা যায় ।
-না বিশ্বাস কর । এমন টা মোটেই নয় । আমার একটা জরুরী কাজ ছিল ।
-মিথ্যা কথা বলার দরকার নাই । আমি আগেই বলেছি আমার কাছে কৈফত দেবার দরকার নাই ।
-সত্যিই আমি মিথ্যা কথা বলছি না ।
-আচ্ছা তাহলে প্রমান কর ।
-কি করতে হবে বল ।
-আমি এখনও আমার জন্ম দিনের কেক কাটি নি । আমায় সাথে এখন চল ।
-কোথায় ?
-যেখানে আমি নিয়ে যাবো ।
আমি কেবল হাসলাম । তারপর থেকে তন্নীর সাথে সম্পর্কটা কেমন যেন বদলে গেল । খুব চট করেই তন্নী খুব কাছে চলে এলো ।

আবার মোবাইলটা বাজছে ! মোবাইল স্ক্রিনে তন্নীর হাসি মাখা মুখটা ভেসে আছে ।
-বল ।
-আসছো তো ?
-আরে বাবা আসছি তো ।
-তোমার কোন ভরসা নাই ।
-আচ্ছা এই কথা কেন বলছ ? আমি কি আগের মত আছি বল ।
-উউউমম ।
- আচ্ছা আজ কি বিশেষ দিন বল তো ? জন্ম দিন তো কদিন আগে গেল । আজকে কি ?
তন্নীর হাসির শব্দ শুনতে পেলাম ।
-জন্মদিন ছাড়া কি মানুষের জীবনে আর কোন বিশেষ দিন থাকে না ? আচ্ছা তুমি আসো তোমাকে বলব ।

বিকেল বেলা ওর সাথে দেখা হল । জারুল গাছের নিচে ও দাড়িয়ে ছিল । এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল । আমাকেই খুজতে ছিল বোধহয় । আমি ওর পাসে গিয়ে টুক করে ওকে চমকে দিলাম ।
-এমন করে কেউ আসে ? আমি হাসি কেবল । ওর দিকে তাকালাম । ওকে বেশ সুন্দর লাগছে ।
-তোমাকে বেশ সুন্দর লাগছে । আর .....
ও একটু হাসল । বলল
-আর ?
-আর বেশ উচ্চ তাপমাত্রা সম্পন্ন মেয়ে মনে হচ্ছে ।
-উচ্চ তাপমাত্রা ? আমি হাসলাম ।
-সহজ ভাষায় বললে তোমাকে আজ হট লাগছে ।
এবার তন্নী একটু লজ্জা পেল । আমি বললাম
-কই বল তোমার বিশেষ দিনটা কি ?
আমরা জারুল গাছের নিচে পেতে রাখা বেঞ্চে বসলাম । ও প্রথমেই কিছু বলল না । কিছুটা সময় নিয়ে ও বলল
-আমাদের বন্ধুত্ব্য টা তোমার কাছে কেমন মনে হয় ?
আমি হাসলাম ।
-এই কথা কেন বলছ ?
-বল না !
ওর চেহারায় কেমন যেন অস্থিরতা দেখলাম ।
-ভাল লাগে । অবশ্যই ভাল লাগে ।
-জানো অপু তোমার প্রতি আমার আলাদা একটা আকর্ষন গোড়া থেকেই ছিল । তারপর তোমার সাথে বন্ধুত্ব্য হবার পর থেকে তোমার সাথে কথা বলার পর থেকে আমি কেমন জানি হয়ে যাচ্ছি । হঠাত্ হঠাত্ সব কিছু কেমন জানি লাগে । কোন কারন ছাড়াই হাসি ! আপনা আপনি চোখে পানি আসে । আমি কিছুদিন থেকে আমার এই আচরন কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না ।
-তাই ?
আমি হাসলাম । বললাম
-তোমার তো সাইক্রাটিস দেখানো দরকার । সত্যি বলছি । আমার পরিচিত একজন ভাল ডাক্তার আছে । যাবে নাকি ?
তন্নী একটু যেন আহত হল ।
-যাবে না ?
-অপু তুমি খুব খারাপ । আগেও আমাকে কেবল কষ্ট দিতে আজ দাও ।
এই বলে ও উঠে পড়ল ।
-আমি তোমার সাথে আর কথাই বলবই না ।
-আরে আরে যাও কই ?
ওকে আবার বসালাম । ওর দিকে তাকিয়ে বললাম
-তুমি যে কথা কাল রাতে বুঝতে পেরেছ , যে কথাটা বলার জন্য আজ আমাকে এখানে ডেকেছ তা আমি অনেক আগে থেকেই জানি । বুঝেছ ?
তন্নী একটু আদুরে গলায় বলল
-জানো ??
-হুম ।
-সত্যি ?
-হুম ।
-তাহলে বলনা কেন ?
-কেন বলবো ? তুমি বল ।
-তুমি বল ।
-না তুমি বল ।
-তুমি ।
-তুমি ।
-না তুমি বল ।
আমি বললাম
-আমি বলব না । তুমি বলবা !
-না তুমি বলো ।

শুক্রবার, ২০ জুলাই, ২০১২

* * অ পূ র্ন * * শেষ পর্ব

 

গল্পঃ * * অ পূ র্ন * * শেষ পর্ব



প্রথম ও ২য় পর্বের পর........................

০৬.
পূর্ন তো কলকাতা চলে গেলো সে জানতে পারলো না সুমিতের কি হলো কিন্তু যখন দেশে ফিরলো সুমিতের চিন্তাটা মাথায় আবার জাগলো..
অপূর্ন বাসায় ফিরে কদ্দিন ঘরে বসে তন্ময় হয়ে অজানা চিন্তার আকাশে ভেবে ভেবে কাটালো।
কি করবে, মাঝখানে কেটে গেছে দেড়টি বছর।
অপূর্ন বাড়ি ফিরে অন্তত এ টুকু বুঝেছে, সুমিতের ব্যাপারে পরিবারের সবার আগ্রহ আর নেই। তাই কদ্দিন চুপ থেকেছে নিজের মনের ব্যাপারটা যেন প্রকাশ পায়। কিন্তু এভাবে তো থাকা যাবে না এটা ভাবতেই অপূর্ন ’র শরীরটা অসার হয়ে যায়।
পুরোনো বন্ধুরা একে একে বাসায় আসতে লাগলো, তাই পুরোনো স্মৃাতিতে ফিরে যেতে অপূর্ন ’র খুব একটা সময় লাগলো না। তবে মাথাটা যে আর আগের মতো কাজ করে না সেটা বুঝে গেছে’সে। আর মাথাটা মনে রাখার খাতায় খুব কম কাজ করে আজকাল।
এই যেমন সকালে ভাবলো, দুপুরে একটু বাইরে বেড়িয়ে আসবে কিন্তু বিকেলে নিজেকে আধভাঙ্গা ঘুমে আবিস্কার করলো।
তবে স্মৃতি যতই দূর্বল হোক সুমিতের কথা কিন্তু মাথা থেকে গেলো না বরং আস্তে আস্তে ফিরে আসতে লাগলো।

এক বিকেলে সব ঝেড়ে ফেলে অপূর্ন বেড়িয়ে পড়লে।
মাধবীলতা বিল্ডিংটার পাশেই ইতি’রা নতুন বাসা নিয়েছে সেটার উদ্দেশ্যে। পথে যেতে সেই বুক হাউসটার বারান্দার দিকে তাকালো; কিন্তু নেই সেই তেলেভাজাওলা। সেই জায়গাতে দাড়াতেই মনে পড়লো সুমিতের সেই সংলাপ; টাকাটা দিতে হবে না।
অপূর্ন ’র সেই এক কথা টাকা আপনাকে দেবই।
কিন্তু না; পারেনি অপূর্ন টাকাটা দিতে হয়তো পারবেও না।

অপূর্ন সোজা চলে এলো ইতিদের বাসায় কিন্তু গেট খুলেই হতাশ হলো ইতি বাসায় নেই। ওর মা এসে ঘরে নিয়ে বসালেন অপূর্ন ঠিক বুঝতে পেরে গেছে এখন কিছু গা গুলানি কথা বলবে। যে সকল কথা রাস্তায় বেরুলেই আজকাল শুনতে হয়; যারা ওকে চিনতো ওরা তো মুখিয়ে থাকে খুব বিরক্তিকর।
ইতি’র মা বলে উঠলেন তোমার লাবন্যমাখা মুখটার এ,কি হাল ও মনে মনে বলে উঠলো ঝড়ের পরে যা হয় আর,কি। ইতি চলে এলো রিকসা নিয়ে সোজা রেল কলোনি এখানেও সেই এক বিপত্তি সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে পরিস্থিতি বলে দেয় সুমিতের জীবনটা নষ্ট করে; পোড়ামুখি তোর স্বাদ মিটেনি, আর কার জীবন নষ্ট করতে এসেছিস।

অপূর্ন সোজা সুমিতদের ঘর অভিমুখে গিয়ে থামলো কিন্তু তালা ঝুলছে।
সুমিত কে, এক ঘরে করে দিয়েছিলো সমাজ; কিন্তু ওর বাবা, মা গেল কোথায়? লাল দালানের পাশে একটা মুদি দোকানে এসে অপূর্ন শুধালো আচ্ছা দাদা সুমিতদের ঘরের সবাই কোথায় গেছে বলতে পারেন? দোকানদার বললো তারা তো প্রায় মাস ছয়েক হলো বাসা বদল করে ওপাড়া চলে গেছে। ও সুমিতের কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থেমে গেল কথা আর বেরুল না মুখ থেকে।

০৭.
বিকেল মরে আসছে।
অপূর্ন ঘরে ফিরে এসেছে ওপাড়া যাওয়া যাবে না বাবা ওখানেই থাকে সন্ধ্যের পর। কলেজ গেটের পাশেই একটা জটলা দেখতে পেল কিন্তুঅপূর্ন সেদিকে গেল না আজকাল আগ্রহ জিনিসটা কাজ করে খুব কম। সেই জটলা থেকে শ্যামলা মতো একটা ছেলে এসে বললো আরে, অপূর্ন যে।
অপূর্ন একটু অবাক হয়েছিলো কিন্তু পড়ে একটা ইচ্ছা উড়াউড়ি করলো অপূর্ন ’র চারপাশ কেননা সেই ছেলেটি সুমিতের একমাত্র বন্ধু রবি।
ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করার পর বললো রবি ভাই সুমিত কোথায় আছে বলতে পারেন?
একটা নিরবতা। এক মিনিট পার হয়ে গেল রবি চুপ। ও আবার বললো কি হলে রবিভাই ? অপূর্ন ভাবলো
সুমিত কি তাহলে মরে গেছে ? না,কি সুমিত কে কেউ মেরে ফেলেছে? নাহ্ সুমিত তো জেলখানায় ছিলো; এমন তো হতে পারে না।
রবি বললো সুমিত কে দেখবে চল।
পায়ে পায়ে অপূর্ন রবি’র পিছু হাটছে বুক হাউসটার ঠিক পাশে এসে থামলো রবি ওকে বাইরে রেখে ভেতরে ঢুকলো; কিছুক্ষণ পড় এসে বললো নেই; কাল দেখা হবে।
ও স্বস্থির নিশ্বাস ফেললো আর যাই হোক সুমিত আছে তাহলে।
ঘরে ফিরে সারারাত বসে ছিলো অপূর্ন । পুরোনো ভাবনা গুলো আবার ওকে উড়ালো আকাশে,বাতাসে। কাল সকালে সুমিত কে পেয়ে কোন কথাটা বলবে? সুমিত কেমন আছো ?
সুমিত আমি এসেছি ?
আমি সেই তোমার পূর্ন ভালবাসার চাঁদ আমি তোমার সেই অপূর্ন ।
অনেক আগে সুমিতের লেখা একটা কবিতা আছে অপূর্ন ’র কাছে; যেটা পড়ে ও ভাবে সত্যি সুমিত তাকে ভালোবাসে ভীষণ ভাবে।
কাল সকালে এই হাত আবার রাখবে হাত সুমিতের সেই হাতে; এবার বাবা,মা কিংবা পরিবারের কেউ আর আটকাতে পারবে না। চলে যাবে দূরে কোথাও।
সকালে ও স্নান সেরে সুমিতের দেয়া শাড়িটা পড়েছে। এ শাড়ি কোনদিন পড়েনি ও। আজ পড়েছে।
বাড়ির বাইরে এসে দেখে রবি দাড়িয়ে। অপূর্ন মনের আঙ্গিনায় পুলকিত হতে হতে পথ মারাচ্ছে। সেই বুক হাউসটার কাছে এসে থেমে গেছে রবি কাল তো এভাবেই থেমে গিয়েছিলো। কিন্তু সুমিত কোথায়?
এই সকালে বাজারে ভীড় নেই। বুক হাউসটাও খালি।
অপূর্ন বললো রবি ভাই কোথায় সুমিত?
রবি বললো দেখতে পারছো না?
অপূর্ন বললো না,তো। পুরোটা পথে দেখবার মতো কেউ নেই শুধু একসাইডে একটা পাগল বসে আছে। রবি হাত উচিঁয়ে বললো তোমার প্রিয় মানুষটাকে চিনতে পারছো না অপূর্ন !!!

না অপূর্ন সেদিন চিনতে পারেনি। অপূর্ন সেদিন মিনিট খানেক স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে ছিলো; কোথায় সুমিত !!!
পাগলটার কাছে গিয়ে দাড়াতেই অপূর্ন অবশেষে চিনতে পেরেছিলো এটাই তার ভালোবাসার জীবন্ত ভাস্কর্য সুমিত। কান্নার আওয়াজে পথের মানুষ ভীড় করে দাড়িয়েছিলো;যেন ম্যাজিক হচ্ছে।
সুমিতের দু হাত জড়িয়ে অপূর্ন কেঁদেছে কিন্তু সুমিত তবুও চিনতে পারেনি ওকে।
পুরো পাগল মুখভর্তি চুলের বাহার। পাগলটা কাঁদেনা ক্ষিদে পেলেও শুধু খাবার চায়। পুরো রাস্তার মানুষ গোল হয়ে দাড়িয়ে। অপূর্ন’র হাত থেকে খাবার নিয়ে খাচ্ছে পাগল সুমিত।
অপূর্ন বলে উঠে,
এই সুমিত আমাকে দেখ আমি তোমার অপূর্ন ?
এই দেখ তোমার শাড়ি পড়ে এসেছি আজ। তুমি না বলেছিলো এই শাড়ি যেদিন পড়বো সেদিন সারাদিন তোমার সাথে ঘুড়তে হবে। আজ আমি সারাদিন ঘুড়বো তোমার হাত ধরে। না সেদির অপূর্ন ’র হাত সুমিত ধরেনি। চিনতেই পারেনি।

০৮.

শ্যামা থেমে গেল।
গল্পটা শেষ।
আমি চোখ মুছলাম। ধূর কি,যে হয়েছে গল্প শেষ করবার পর আমার চোখ থেকেই পানি ঝড়ছে।
আমি ভাঙ্গা গলায় বললাম আচ্ছা; আপনি সুমিত, আর অপূর্ন’র জীবন কাহিনী জানলেন কিভাবে? আপনি ওদের কেউ হন মানে বন্ধু জাতীয়।
শ্যামা ব্যাগটা হাতে উঠিয়ে নিয়ে বললো কি,মনে হয় আপনার?

আমি বললাম প্লিজ বলুন না। না হলে সারারাত ঘুমুতে পারবো না। আর আমার সুমিত কে দেখতে ইচ্ছে করছে আর তার চেয়ে কষ্ট লাগছে অপূর্ন’র জন্য তাকে দেখতে পেলে একটা কথা বলতাম?
শ্যামা বললো কি কথা? আমি বললাম আগে আপনি বলুন আপনার সাথে সুমিতের কি সম্পর্ক?
শ্যামা মাথাটা নিচু করে বললো আমিই সেই অপূর্ন !!

কথাটা কানে যাবার সাথে সাথে ট্রেনটার হুইশেল বেজে উঠলো। গন্তব্যে এসে গেছি শ্যামা নামধারী অপূর্ন হাতে ব্যাগ নিয়ে উঠে দাড়ালো। আমিও দাড়ালাম ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মে ।
অপূর্ন আমার পিছু এসে দাড়ালো
আমি বিস্ময়ের ঘোর ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বললাম আপনিই তাহলে সেই গল্পের নায়িকা; আচ্ছা সুমিত এখন কেমন আছে? আর তাছাড়া আপনিই বা কোথায় চলেছেন?
রেল গেটের বাইরে এসে অপূর্ন বললো সুমিত ভালো নেই!! আর আমি যদি এখানে থাকি তাহলে কষ্ট পাবো প্রতিনিয়তই যখনি পথ চলতে সুমিতকে দেখবো তখনই তো কষ্টের আকাশে দগদগে কালো মেঘ ভাসবে।
তাছাড়া আমি থাকলে সুমিত কে ওরা মেরে ফেলবে। আমি তাই দুরে চলে যাচ্ছি পাগল হয়ে ঘুরুক তবুও বেঁচে থাকুক।
আমি আবার বললাম কারা সুমিত কে মেরে ফেলবে ? অপূর্ন বললো কারা আবার আমার বাবা’র লোকেরা।
আর তাছাড়া আমার নামটাই তো অপূর্ন যার নামের মাঝে পূর্নতা নেই সে আর কার জীবনকে পূর্ন করবে বলুন।

আমার যাবার সময় হয়ে এসেছে; এদিকে অপূর্ন’র রিকসা দাড়িয়ে আছে।
বিদায় নেবার আগে আমার হাতে একটুকরো কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললো এটা সুমিতের লেখা সেই কবিতাটা যেটা ছাপাতে পারেনি আপনি একটু চেষ্টা করে দেখবেন। আমি হ্যাঁ বলালাম।
জীবন কখনো কখনো এমন হয়...................
হাজার ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেল অপূর্ন আর আমি কবিতাটা পড়তে পড়তে পথ চললাম


কখনো কি ভাবতাম; এতো লোকের ভীড়ে তোমায় পাবো;
ভাবতে পারতাম না।
কখনো কি ভাবতাম; ; এতোটা পথ হেটে যাবো অবলীলায়
ভাবতে পারতাম না।
এখন ভাবতে পারি নির্ভাবনায়; আর আমি একা নই
আমার শূন্য দু’ হাত পরিপূর্ন তোমার ছোয়ায়
কখনো ছেড়োনা হাত,
করো না সংঘাত
আমি যে থাকবো মিশে তোমারই নিশ্বাসে নিশ্বাসে।