[url=http://www.gulfup.com/?AomQ4i][img]http://www.gulfup.com/G.png[/img][/url]

রবিবার, ২২ জুলাই, ২০১২

ভালবাসায় মনোনিবেশ


ভালবাসায় মনোনিবেশ

যদি আমার তরে তোমার হৃদয়
করো ভালবাসায় মনোনিবেশ;
তবে দূর করো আজি মনোবেদনা
জাগুক হৃদয়ে স্বপ্নীল মনোবাসনা।


পশ্চাতে ঠেলে দাও নির্ভয়ে পুরোনো
হৃদয়ের সবটুকু মান-অভিমান;
তোমার প্রতি বাড়বে মম মনোধিকার
ভালবাসা আজি দু’জনার সমোধিকার।

করো চরিতার্থ নিশীতে স্বপ্নালোকের
মাঝে তোমার শত কামনা-বাসনা;
তোমার তৃষায় দূরীভূত হোক বেদনা
জাগুক যুগল মনে ভালবাসার চেতনা।


স্বপ্নের বিভোরে খুলে দাও তোমার
অবরুদ্ধ করা তমাট মনোমন্দির;
রাখ অটুট চিরতরে ভালবাসার মনোবল
ঘুচে যাক দুঃখ-ঝরুক চোখের নোনাজল।

শীতল করো মন ভালবাসায় রাঙ্গিয়ে
জীবনের গদ্যে-পদ্যে হৃদয় মনোরঞ্জন;
প্রেম যেন না হয় মিছে শুধু মরীচিকা
স্বপ্ন যেন না হয় প্রেমহীন বিভীষিকা।

সব মেঘ গর্জনে আমি রইবো তোমার পাশে

 

সব মেঘ গর্জনে আমি রইবো তোমার পাশে
 

আজ দুইদিন ধরে পৃথিশার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি । ওর সামনে পড়তে চাচ্ছি না । কেমন জানি একটা অস্বস্তি খেলা করছে বুকের ভিতর ।
কি সহজ সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিল ওর সাথে আর এখন কেমন জানি হয়ে গেল । হয়তো কিছুই হয় নি কিন্তু নিজের কাছে কিছুতেই সহজ হতে পারছি না । স্যার ঢোকার পরপরই ক্লাস রুমে ঢুকেছি তাই পৃথিশা কথা বলার সুযোগ পায় নি । এখন স্যার ক্লাস রুম থেকে বেরোনোর সাথে সাথে বের
হয়ে যেতে হবে যাতে পৃথিশা আমাকে ডাকার সুযোগ না পায় । কিন্তু যেমনটি ভাবলাম তেমনটি হল ।
ক্লাস রুম থেকে বের হতে যাবো ঠিক এমন সময়ই পেছন থেকে ডাক শুনতে পেলাম
-এই আবির । দাড়া বলছি ।
পৃথিশা ডাকছে । ডেকে যখন ফেলেছে দাড়াতেই হল । আমার সামনে এসে বলল
-মোবাইল হারিয়ে ফেলছিস ?
-মোবাইল হারাবো কেন ?
-কাল আর পরশু মিলে কত বার ফোন দিয়েছি ?
আমি হিসাবটা জানি । পরশু দিন থেকে ও কম করে হলেও সত্তর বার ফোন দিয়েছে । মেসেজও পাঠিয়ে অনেক গুলো ।
আমি ধরি নি ।
বলতে গেলে ধরতে পারি নি । অস্বস্তির জন্য ।
-সাইলেন্ড ছিল তো বুঝতে পারি নি ।
-পরে তো দেখেছিস । ব্যাক করিস কেন ?
-আসলে ........
-থাক মিথ্যা কথা বলতে হবে না । আমি দুদিন ধরে দেখছি তুই আমাকে এড়িয়ে চলছিস । কারনটা বলবি ?
-কই না তো এড়িয়ে চলছি না তো । এড়িয়ে চলবো কেন ? আশ্চর্য ।
-আমার সাথে মিথ্যা কথা বলার ট্রাই করিস না । এখন পালাচ্ছিলি কেন ?
-পালাবো কেন আশ্চর্য ?
-আমি তোর বিহেবিয়ার খুব ভাল করে জানি । তুই যখন কিছু লুকাতে চাস তখন তুই কথার শেষে বারবার আশ্চর্য লাগাস । আর তোর নাক ঘামতে থাকে ।
কথা সত্য । নাকে হাত দিয়ে দেখলাম সত্যি নাক ঘামতেছে ।
-না সত্যি এখন আমার একটা জরুরী কাজ আছে । এখনই যেতে হবে ।
মনে হল না যে পৃথিশা আমার কথা বিশ্বাস করেছে । বলল
-ঠিক আছে যা । তবে বিকাল বেলা দেখা করবি ।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম টিউশনি আছে কিন্তু আমার বলার আগেই পৃথিশা বলল
-আমি জানি আজ তোর টিউশনি নাই ।
তারপর কি মনে হল পৃথিশা আমার আর একটু কাছে এসে দাড়াল । আমার হাতটা ধরে বলল
-আমার হাত ছুয়ে কথা দে যে দেখা করবি । বল ।
আমি অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলাম ।
ওর চোখের দিকে তাকাতেই অস্বস্তিটা আরো বেড়ে গেল । কি গভীর চোখেই না ও তাকিয়ে আছে আমার দিকে । এই দৃষ্টিটা আমার একদমই পরিচিত নয় ।
-আচ্ছা আমি কথা দিলাম । আসবো ।
পৃথিশা ক্লাস রুমের ভিতরে চলে গেলো । আমি পালালাম ওখান থেকে ।

বলতে গেলে পৃথিশা আমার সব থেকে ভাল বন্ধুদের একজন । একজন বলছি কেন ও ই সব থেকে ভাল বন্ধু আমার । ওর সব থেকে যে দিকটা আমার ভাল লাগে সেটা ও সব কিছু সোজা সুজি বলে । কোন ঘুরিয়ে পেচিয়ে না । একজনকে ওর পছন্দ না সরাসরি বলবে যে পছন্দ না । কথা ঘোরাবে না । আর ও কোন কিছুতে লুকোছাপা করতো না । একটু এক গুয়ে । যা একবার বলবে তা করবেই ।
এমন একটা মেয়ের সাথেই ছিল আমার বন্ধত্ব । ওর সাথে সময় বেশ ভালই কাটছিল । আমাদের সম্পর্কটা বেশ সহজ আর স্বাভাবিক ছিল । আমরা একসাথে পড়তাম খেতাম ঘুরতাম গল্প করতাম । কি চমৎ‍কারই না দিন কাটছিল !
কিন্তু সব কিছু কেমন পরিবর্তন হয়ে গেল দুদিন আগে । দুদিন আগে ওর সাথে সোঁনার গায়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম । আমাদের প্লান ছিল বিকালের মধ্যেই ফেরত্‍ আসবো । সোঁনার গা দেখার পর আমরা পাশের একটা গ্রামের পথ ধরে হাটছিলাম ।
সত্যি বলতে ওর সাথে হাটতে খুব ভাল লাগছিল । পৃথিশাকে হাসি খুশি লাগছিল । কিন্তু হঠাত্‍ ওর মুখটা কালো হয়ে গেল । আমি বললাম
-কি হল ? তোর মুখটা ওমন কেন হয়ে গেল কেন ??
ও আকাশের দিকে ইশারা করে বলল মেঘ জমছে ।
-তো কি হয়েছে ? আমরা গ্রামের কোন ঘরে আশ্রয় নিয়ে নেবো । সমস্যা কি ?
-না না চল । জলদি চল ।
-কেন ? দেখ না কি চমৎ‍কার একটা আবাহাওয়া । আর একটু থাকি না ?
কিন্তু পৃথিশার চেহারায় কেমন জানি একটা অস্বস্থিরতা দেখতে পেলাম । ও বারবার বলতে লাগল
-চল আবির । প্লিজ চল ।
আর থাকা গেল না । ওকে নিয়ে রওনা দিলাম । কিন্তু এতো দ্রুত সারা আকাশ কালো হয়ে গেল যে আমরা খুব বেশি যেতে পারলাম না । পুরো আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল । আর বিদ্যুৎ‍ চমকাতে লাগল । বাধ্য হয়ে একটা বড় বটগাছের নিচে দাড়াতে হল ।
একটু পর খুব জোড়ে বিদ্যুৎ‍ চমকাতে লাগলো । আমি অবাক হয়ে দেখলাম পৃথিশা কেমন জানি ভয় পাচ্ছে । প্রতিটা বর্জ্যপাতের সাথে ওর চেহারায় কেমন একটা ভয়ে চিহ্ন দেখা দিচ্ছে । বাচ্চা মেয়ে মত ভয়ে কুড়রে উঠছে ও ।
আমি ওর হাত ধরলাম ।
-কি হয়েছে পৃথু ? এমন করছিস কেন ?
ঠিক তখনই খুব জোড়ে বাজ পড়ল । পৃথিশা এতোই ভয় পেলো যে আমাকে জড়িয়ে ধরল । এতো জোড়ে জড়িয়ে ধরল যে আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগা আরাম্ভ করল ।
প্রতিবার বাজ পড়ছিল আর ও আরো একটু একটু করে আমাকে জড়িযে ধরছিল । কি করবো ঠিক মাথা কাজ করছিল না । তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম যে ও বর্জ্যপাতে ভয় পাচ্ছিল । আমার জড়িয়ে ধরে ও আশ্রয় খোজার চেষ্টা করছিল । যতক্ষন আকাশে মেঘ ডাকছিল ও আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল । তবে শেষের দিকটা ওর ভয় পাওয়ার মাত্রটা একটু কম ছিল ।
মেঘ ডাকা কমে গেলে আমরা ঢাকা দিকে ফিরে আসি । পুরো রাস্তা ধরে ও এক দম চুপ করে থাকল । আমার হাতটা একটা বারের জন্যও ছেড়ে দেয় নি । মনে হচ্ছিল যেন বাচ্চা একটা মেয়ে । কোন কিছু দেখে ভয় পাচ্ছে । তাই আমার হাত ধরে রেখেছে ।
ওকে হলে পৌছে দিলাম কিন্তু আমার মনের ভিতর একটা অস্বস্তি রয়েই গেল । বার বার ঐ সময়ের কথা আমার মনে পরছিল । পৃথিশা কিভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল ।
এই অনুভুতিটা আমি কিছুতেই মুছে ফেলতে পারছি না । তাই বিকেল বেলা যখন ওর সাথে দেখা হল খুব অস্বস্তি লাগছিল ।

আমি বসে ছিলাম জারুল গাছটার নিচে । পৃথিশা কেমন এলোমেশো পা ফেলে এগিয়ে আসছিল । কিছু একটা ভাবছিল । কাছে আসতে ওকে বললাম
-কেমন আছিস ? কেন জানি ওকে তুই করে বলতে একটা কষ্ট হচ্ছিল ।
-ভাল । পৃথিশা হাসল ।
আমার কাছে এসে বসল । কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থাকল । একসময় বলল
-কিছু বলছিস না কেন ?
-কি বলব ? তুই না বললি কি যেন বলবি ।
পৃথিশা আরো কিছুক্ষন চুপ করে থাকল । তারপর হঠাৎ‍ করে বলল
-তুই খুব অবাক হয়ে ছিলি না ?
- হুম ? কি বললি ?
-ঐ দিন যে তোকে জড়িয়ে ধরেছিলাম । অবাক হয়েছিলি ?
-একটু হয়েছিলাম ।
-এই জন্য আমার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলি ?
-পালাবো কেন ? আশ্চার্য !
পৃথিশা হেসে ফেলল ।
-তুই আসলেই একটা গাধা । ঠিক মত মিথ্যা কথাও বলতে পারিস না ।
আমি কিছু বললাম না । ও আবার বলল
-জানিস আবির আমি মেঘ ডাকা খুব ভয় পাই । সেই ছোট বেলা থেকে । এতো ভয় লাগে আমার । এই জন্য তোকে জড়িয়ে ধরেছিলাম । ভয়ে ।
-ঠিক আছে সমস্যা নাই ।
-জানিস আগে এতো ভয় পেতাম । মাঝে মাঝে তো অজ্ঞান হয়ে যেতাম ।
-এতো ভয় কেন পাস ?
-জানি না ।
-ওকে সমস্যা নাই । চল কিছু খাওয়া যাক ।
আমি উঠে দাড়ালাম ।
-আবির বস । আমি এখনও কথা শেষ করি নি ।
আমি আবার বসে পড়লাম । ও বলল
-আমি সারা জীবন মেঘ ডাকাকে এতো ভয় পেয়েছি তোকে কিভাবে বোঝাবো ? কিন্তু সেদিন যখন তোকে জড়িয়ে ধরেছিলাম প্রথম প্রথম খুব ভয় লাগছিল । কিন্তু একটা সময় এসে আমি লক্ষ্য করলাম আমার আর ভয় লাগছে না । আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম । তোমার বুকে আমি নিজেকে এতো নিরাপদ বোধ করছিলাম যে তোকে বলে বোঝাতে পারবো না ।
পৃথিশা চুপ করে থাকল কিছুক্ষন ।
আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না ।
-আবির ?
-হুম ।
আমি পৃথিশার দিকে তাকালাম । ওর ঠোট দুটো কাঁপছে । কিছু যেন বলতে চাইছে । কিন্তু বলতে পারছে না । ওর চোখ দুটো নির্বাগ চাহনিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । চোখের ভিতে পানি জমতে শুরু করেছে ।
আমি হঠাৎ‍ করে বুঝে ফেললাম ও কি বলতে চায় ।
হঠাৎ‍ করে সেই অস্বস্তিটা চলে গেল ।
ওখানে কেমন যেন একটা ভাল লাগা আমার পুরো মন কে স্পর্শ করল । ওকে বললাম
-তোকে কিছু বলতে হবে না ।
ওর হাত দুতো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম
-আমি সব সময় তোর পাশে থাকবো ।

পৃথিশার চোখ দিয়ে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়ল । আমি সেই অদ্ভুদ ভাল লাগা অনুভূতি নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম ।


অননিতার গল্প

 

অননিতার গল্প

অননিতা যখন এস্টেটার গেটের সামনে দাড়াল তখন বিকেল ছুই ছুই করছে । রোদ আছে কিন্তু রোদের তেজ অনেকটা কম । অবনিতা নামটা আবার পড়ল ।
মামুন এস্টেট । অননিতা আরো একবার ঠিকানা টা মিলিয়ে নিল । হুম এটাই সেই জায়গা ।
গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই একটা লোক এগিয়ে এল । পোষাক দেখে মনে হল দারোয়ান হবে হয়তো ।
-কার কাছে যাইবেন ?
-এখানকার এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মাহাফুজ করিম , ওনার বাংলাটা কোন দিকে বলতে পারেন ?
দারোয়ান গোছের লোকটা প্রথমে কি যেন ভাবল । কিছু যেন মনে করার চেষ্টা করছে ।
অননিতার ভয় হল হয়তো লোকটা বলবে মাহাফুজ করিম নামে এই চা বাগানে কেউ চাকরী করে না ।
-আবির স্যারের কতা বুলছেন ?
অননিতার জানে পানি এল । এতো দিন পর আবিরকে খুজে পাওয়া গেল ।
-হ্যা । আবির । আমি ওর ওয়াফ । মানে স্ত্রী ।
লোকটা হাসল ।
-মেমসাব ওয়াপের মানে জানা আছি । লোকটা আবার হাসল ।
-আপনি একটু খাড়ান আমি ভ্যান লিয়ে আসছি । সারের বাংলো একে বায়ে শেষ মাথায় ।
লোকটা বেশ সাহায্য করল । নিজেই ভ্যান নিয়ে এল । ব্যাগটাও অননিতাকে তুলতে দিলো না । বলল
-আপনে আবির সারের ওয়াইপ । আপনাকে ব্যাগ তুলবেন আর হামি চাইয়ে চাইয়ে দেখমু তা হবি না ।
ভ্যানটা যখন এস্টেট টার মাঝ খান দিয়ে যাচ্ছিল অননিতা চারিপাশে তাকিয়ে দেখছিল । চারি পাশে কি শান্তির একটা ছায়া রয়েছে । আবিরের সব সময় এমন একটা চা বাগানে চাকরি করার স্বপ্ন ছিল । ওর আগেই বোঝা উচিত্ ছিল । তাহলে আরো আগে ওকে খুজে পাওয়া যেত ।
গত কাল তুহিন যখন ফোন করে আবিরের ঠিকানাটা দিল ওর প্রথমে বিশ্বাসই হয় নি । প্রায় দুইমাস ধরে আবির গায়েব । কোন খোজই পাওয়া যাচ্ছিল না ।
অননিতা কোথায় খোজ করে নি ? প্রথমে ভেবেছিল হয়তো আবির ওর গ্রামের বাড়ি গিয়েছে । কিন্তু না । ওখানে সে যায় নি । তারপর ওর যত বন্ধুবান্ধব আছে সবার বাসায় ও গিয়েছিল । সম্ভাব্য সব জায়গায় ও আবির কে খুজেছে । কিন্তু আবির যেন একেবারেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল ।
প্রথম প্রথম অননিতার মনে হত আবির হয়তো ওর সাথে ফান করছে । কিংবা ওর উপর অল্প স্বল্প রাগ করেছে । রাগ পড়ে গেলেই চলে আসবে । কিন্তু এক সপ্তাহ পরেও যখন আবির এল না তখন অননিতা খুব টেনশনে পড়ে গেল ।
-এই যে আবির সারের বাংলু ।
অননিতা ভ্যান থেকে নেমে পড়ল । লোকটাকে টাকা দিতেই লোকটার ৩২টা দাঁত আনন্দে বের হয়ে গেল । বাংলোর সিড়ি পর্যন্ত ওর ব্যাগ পৌছে দিল ।
বাংলোটা বেশ সুন্দর । সিমসাম ছোট । অননিতার মনটা ভাল হয়ে গেল । একে তো আবিরকে পাওয়ার আনন্দ তার উপর এতো সুন্দর একটা পরিবেশ । অননিতার মনে হল আজকের দিনটা ওর জন্য খুব আনন্দের ।
বাংলোর মেইন দরজা খোলাই ছিল । ওর সারা শব্দ পেয়ে একটা বুড়ো মত লোক বেরিয়ে এল ।
-কাকে চান ? লোকটা এই প্রশ্নটা করেই খানিক চুপ করে থাকল । ওর চেহারাটার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন । একটু পর বুড়োর মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল । বলল
-অনেকটা পথ এসেছেন । ক্লান্ত নিশ্চয় ? আমার সাথে আসেন ।
-আমি আসলে আবির .......
অননিতা বলতে গেল । বুড়ো মত লোকটা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল
-আমি বুঝতে পেরেছি আপনি কে । আমি স্যারের বাবুর্চি । স্যারের সব দেখাশুনা আমিই করি । স্যারের আসতে আরো কিছু সময় লাগবে । আপনি ফ্রেস হয়ে নিন । এইটা স্যারের রুম ।
অননিতা আর কোন কথা বলল না । তবে একটু অবাক হল । বুড়ো ওকে চিনল কিভাবে ? যাক পরে এক সময় জিজ্ঞেস করতে হবে ।
অননিতা আসলেই অনেক ক্লান্ত ছিল । সারাটা দিন জার্নির উপরই ছিল । তুহিনের কাছ থেকে খরব পেয়ে ও আর দেরি করে নি একটুও । কোন রকম প্রস্তুতি ছাড়াই চলে এসেছে । ওর কেবল মনে হচ্ছিল যে কোন ভাবেই আবিরের কাছে ওকে যেতে হবেই ।
ফ্রেস হবার পর ওর ক্লান্তিটা একটু কম মনে হল । বিছানার এসে গা এলিয়ে দিল ।
চোখ যখনই সিলিংয়ের দিকে গেল একটা ধাক্কার মত খেল ও । পুরো বিছানার সমান বড় একটা পেইন্টিং সিলিংয়ে আটকানো । যেই বিছানায় শোবে সরাসরি চোখ পরবে পেইন্টিং টার দিকে । অননিতা চমকালো । কারন পেইন্টিংটা ওর নিজের ।
আবির সব সময় ঘুম থেকে উঠে ওর মুখ দেখতে চাইতো । ও বলত আমি যাকে সব চেয়ে ভালবাসি প্রতি দিন যেন তার চেহারা দেখেই আমার ঘুম ভাঙ্গে । এখানেও যেন ঘুম ভাঙ্গার পর আবির ওকেই দেখতে পায় সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে । আর এই জন্য বুড়ো বাবুর্চি ওকে চিনতে পেরেছে ।
অননিতা একটু চোখ বুজল । আজ প্রায় দুই মাস পর ও যেন একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারছে ।

অননিতা সব সময় একটু উশৃঙ্খল টাইপের ছিল । সব কিছুতেই ওর যা ইচ্ছা তাই করতো । কারো বাধা শুনতো না । কিন্তু অননিতা সব সময় ওর বাবাকে দেখে ভয় পেত । যদি ওর বাবা ওর কোন কাজেই বাঁধা দিতো না কিন্তু বাবার রাগ কে ও খুব ভয় পেত । তাই যখন ওর বাবা ওর বিয়ের জন্য আবির কে নিয়ে এল অননিতা আপত্তি করার সাহসই পায় নি ।
বিয়ের পর ওরা আলাদা বাসায় উঠে এল । অননিতা আরো আবিষ্কার করল যে আবির খুবই ভাল একটা ছেলে । ও যেন আরো একটু ছাড় পেয়ে গেল । আগে তো বাবা নজর দাড়ি ছিল । তাই কোন কিছু করতে হলে একটু ভয় ভয় করতো । বিয়ের পর সেই ভয়টুকুও রইল না । আবির সারাদিন অফিস করত । সন্ধ্যায় বাসায় এসে ওর সাথে সময় কাটাতো ।
সারা দিনে কোথায় ছিল কি করছিলে এমন কিছুই জিজ্ঞেস করতো না । মোট কথা অননিতা খুব আনন্দেই ছিল । আর একটা ব্যাপার অননিতা খ্যাল করলে আবিরের সঙ্গ ওর ভাল লাগছে । ও যতই বাইরে বাইরে থাকুক অন্য মানুষের সাথে মিশুক , আবিরের সাথে কাটানো সময় গুলো ওর কাছে বেশ মধুরই মনে হত । সব থেকে বড় কথা অননিতা খুব ভাল করে টের পেত আবির ওকে ভালবাসতে শুরু করেছে । ব্যাপারটা অননিতা নিজেও খুব উপভোগ করত ।
এভাবেই ওর দিন গুলো কাটছিল কিন্তু একদিন এর স্বন্দ পতন হল । ঐ দিন অননিতার এক বান্ধবীর বাসায় পার্টি ছিল । বেশ রাতই হয়ে গেছিল । বাসায় আসছিল না দেখে আবির নিজেই পার্টিতে হাজির হয় । অননিতা তখন ড্রিংস করায় ব্যস্ত । আবীব মোটামুটি জোড় করেই ওকে বাসায় নিয়ে এল ।
অননিতা বোধহয় একটু বেশিই ড্রিংস করে ছিল । বাসায় এসেই আবীরের উপর ঝাপিয়ে পড়ল । আবীর কে বলল
-তোমার সাহস তো কম না ! তুমি কোন সাহসে আমাকে নিয়ে আসলে ?
-অননি আমি তোমার হাসবেন্ড । এই অধিকার আমার আছে ।
-হাসবেন্ড মাই ফুট । আমার বাপের অফিসে চাকরী করে আমার বাপের তা খেয়ে এমনকি আমার বাপের দেওয়া ফ্লাটে থেকে তুমি কোন সাহসে আমার উপর অধিকার ফলায় । এক্ষনি তুমি বের যাও আমার বাসা থেকে । আমি তোমার মুখ যেন আর না দেখি ।
অননিতার যদিও হুস ছিল না , তবুও আবীরের কাছে কথা গুলো খুব খারাপ লেগেছিল । ঐ রাতের বেলা ও বাসাতেই ছিল কিন্তু সকাল হতেই ব্যাগ গুছিয়ে ঐ বাসা থেকে বের হয়ে গেল ।
সকালে অননিতার ঘুম ভাঙ্গলে রাত্রের সব কথা ওর মনে পড়ে যায় । ও ভেবে রাখে যে সন্ধ্যায় আবীর যখন অফিস তখন অফিস থেকে আসবে তখন ওকে সরি বলবে । বেচারা নিশ্চই অনেক কষ্ট পেয়েছে ।
কিন্তু যখন সন্ধ্যার পরেও যখন আবীর যখন বাসায় আসল না , অননিতার কেমন যেন একটা ভয় করতে লাগল । ওর ভয়টা সত্যি হল যখন বাড়ির কাজের লোকটা বলল যে আবীর সকাল বেলা বড় একটা ব্যাগ নিয়ে বের হয়েছে ।
অননিতা ভয়তে ওর বাবাকে কিছু বলতেও পারছিল না । ঠিক সাত দিন পর অননিতার বাবা ওকে ফোন করল । ফোনে বলল
-কি ব্যাপার আবীর কই ?
অননিতা কিছু বলতে পারল না ভয়তে । ওর বাবা বলল
-ও আজকে রিজাইন করেছে । ওর মোবাইল ও অফ পাচ্ছি । কি হয়েছে বলত ?
অননিতা বলল
-আব্বু ও বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে ।
-কেন বাড়ি ছেড়ে যাবে কেন ?
অননিতা বুঝল আর চুপ করে থেকে লাভ নেই । আস্তে আস্তে সব বলে দিল । সব শুনে অননিতা বাবা খুব রাগ করল । অননিতাকে বলল
-তুই আবীরকে খুজে কে খুজে আনবি তারপর আমার সামনে আসবি ! এর আগে আমি তোর মুখ দেখতে চাই না ।
তারপর থেকেই অননিতা ওকে পাগলের মত খুজে বেড়াচ্ছে ।

প্রতিদিনই অফিস থেকে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায় । আবীর চায় আরো ব্যস্ত থাকতে । সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওর সময়টা ভালই কেটে যায় । কাজের মধ্যে ডুবে থাকে । কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে আর সময় কাটতে চায় না কিছুতেই । কেমন যেন সব কিছু থেমে যায় ।
ও ভাবে নি যে অননিতাকে ও অতো খানি মিস করবে ? মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ দিন ওভাবে চলে না আসলেও তো হত । অননিতা ড্রাঙ্ক ছিল । কি বলতে কি বলেছে ! কিন্তু কথা গুলো ওর ঈগোতে বড় লেগেছিল ।
অননিতার উপর প্রচন্ড এক অভিমান জন্মে ছিল বুকে । যাকে ভালবাসা যায় তার উপর তো অভিমান করা যায় ।
সন্ধ্যার কিছু পর কাজ শেষ হল । সারা দিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে । বাসায় গিয়ে একটা ঘুম দিতে হবে । আবীরের কাছে এই চা বাগানের চাকরীরা অনেক আকর্ষনীয় ছিল । আবীর অনেক দিন থেকেই এরকম একটা চাকরীর চেষ্টাই ছিল । ইচ্ছা ছিল এরকম একটা চাকরী হলে অননিতাকে নিয়ে চলে আসবে । তারপর দুজনে মিলে খুব সুন্দর একটা জীবন কাটাবে ।
কিন্তু অননিতাকে ছাড়া এই আকর্ষনীর চাকরীটা মোটেই খুব বেশি আকর্ষনী মনে হচ্ছে না । এই চা বাগানের সৌন্দর্য আবীরকে খুব আনন্দ দিতে পারছে না । আবীর খুব ভাল করে বুঝতে পারছে ওর সামনের দিন গুলো আরো কষ্ট নিয়ে আসবে ।
ও বাসার দিকে রওনা দিল । ইদানিং আর একা একা বাইরে বেশি ভাল লাগে না । নিজের শোবার ঘরটাই ওর কাছে এখন ভাল লাগে । যখন ও নিজের বিছানায় শোয় তখন ও অননিতা মুখটা দেখতে পায় ।
কি যে ভাল লাগে ওর ! বাসার কাছে চলে এসেছে এমন সময় ওর ফোনটা বেজে উঠল ।
তুহিন ফোন করেছে ।
-বল ।
-দোস্ত একটা কাজ করে ফেলেছি ।
-কি করেছিহ ?
-অননিতাকে তোর ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি ।
আবীর কিছু বলতে গিয়েও বলল না । তুহিন আবার বলল
-প্লিজ রাগ করিস না । ও তোর ঠিকানা পাগলের মত খুজতেছিল । খুব অস্থির হয়ে গিয়েছিল । আমি আর না দিয়ে থাকতে পারি নি । প্লিজ কিছু মনে করিস না । আর কত দিন ওর উপর রাগ করে থাকবি ?
-আচ্ছা ঠিক আছে ।
ফোন রাখার পর আবীরের কেন জানি একটু আনন্দ বোধ হচ্ছে । ওর মনে হচ্ছে দু এক দিনের মধ্যে অননিতা ওর এখানে চলে আসবে । ওর এই কথা মনে হতেই খুব ভাল লাগতে লাগল ।

আবীর যখন ওর বাংলোতে পৌছিয়ে তখন বেশ অন্ধকার । বাংলোতে কোন আলো জ্বালানো হয় নি ।
-এই সগির মিয়া এতো আলসে হয়েছে ! সন্ধ্যার সময় আলোটাও জ্বালাতে মনে থাকে না । বাংলোর সিড়িতে উঠে বলল সগির মিয়া ! লাইট জ্বালাও নি কেন ? সন্ধ্যার ঘরবাড়ি অন্ধকার কেন ? ঠিক তখনই আলো জ্বলে উঠল ।

আবীর খুব চমকে উঠল । ওর ঘরের চৌকাঠের সামনে অননিতা দাড়িয়ে আছে । কেমন চোখ ছলছল চোখে ।
আবীরের প্রথমে মনে হল ওর হয়তো চোখে ভুল । অননিতা একটুও দেরি করল না সরাসরি ওকে জড়িয়ে ধরল ।
আবীর কোন কথাই বলতে পারল না । কেবল একটা আনন্দের অনুভূতি ওকে ঘিরে ধরল । আবীর ভেবেছিল অননিতা আসবে কিন্তু একেবারে আজকেই আসবে ও ভাবতেই পারে নি ।
একসময় আবীর অনুভব করল যে অননিতা কাঁদছে ।
-কাঁদছো কেন ?
-কাঁদবো না তো হাসবো ? গাধার মত কথা বলবা না ।
আবির হাসলো ।
ফোপাতে ফোপাতেই বলল
-তুমি এমন করে আমাকে কেন কষ্ট দিলে ? আমি কি ইচ্ছে করে ওসব বলেছিলাম । তুমিতো জানতে আমি ড্রাঙ্ক ছিলাম । আমার কথায় এতো রাগ করলে কেন ? কেন এভাবে আমাকে ছেড়ে চলে এলে ? আমার কথা একবারও মনে পড়ে নি ?
আরো কতশত অভিযোগ !
আবীর কোন কথা বলে না ।
অননিতাকে আরো নিবির করে জড়িয়ে ধরে । ওর বুকের স্পন্দন দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চায় তোমাকে ছেড়ে আর কোন দিন যাবো না । দুরে ছিলাম কিন্তু মনটা তো তোমার কাছেই পড়ে ছিল । কতক্ষন ওরা একে ওপরকে জড়িয়ে ধরেছিল ওদের নিজেদের কোন সময় জ্ঞান ছিল না । সগির মিয়ার কথায় খ্যাল হল ।
-রাতে কি খাবেন স্যার ?

আমাদের অর্পা আর অরন্য..

আমার ছোট বাবা.... অর্পা


আমার ছোট বাবা.... অর্পা

অরন্য  আমার ছোট সোনা বাবা.....
এইত 16 ই জুলাই এল এ পৃথিবীতে....





অভীমান যত মনে সব মুছেদিল ও এসে পৃথিবীতে......
অনেক miss লক্ষি সোনা...

 

আমি বৃষ্টি দেখেছি

আমি বৃষ্টি দেখেছি

নীলুর বৃষ্টি অনেক পছন্দ ছিল । বৃষ্টি হলে আর কোন কথা নাই । ওর মাথায় কি এক অদ্ভূদ চিন্তা ছিল যে বৃষ্টি হলে ওকে ভিজতেই হবে । কোন সময় জ্ঞান নাই । বৃষ্টি মানে ভিজতেই হবে ।
ইনফ্যাক্ট ওকে আমি প্রথম লক্ষ্য করি এই বৃষ্টিতে ভেজা নিয়েই । একদিন ক্লাস করছিলাম । ও আমার পরেই বসে ছিলাম । হঠাৎ আমার নাম ধরে ডাকল ।
-এই অপু ? এই ?
এমনি চিনতাম ওকে । কিন্তু এর আগে কখনও কথা হয়নি ওর সাথে ।
-এই শোন না !
আমি একটু অবাক হলাম । একটু বিরক্তও । কোন দিন কথা বলি নি । প্রথম কথাতেই তুই ।
-কি ?
-আমার বই আর খাতাটা একটু রাখতো !
আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নীলু বের হয়ে গেল । আমি সত্যি অবাক না হয়ে পারলাম না ! বাইরে ততক্ষনে ঝুম বৃষ্টি আরাম্ভ হয়েছে । একটু পর লক্ষ্য করলাম নীলু বাচ্চা কয়টা ছেলে মেয়েদের সাথে বৃষ্টির ভিজছে । বলতে গেলে নাচা নাচি করছে ।
এতো বড় একটা ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে যে এমন করে বৃষ্টিতে ভিজতে পারে আমার ধারনার বাইরে ছিল ।

উহু ! নিজের মনকে আবারও একটা ধমক দিলাম । আমি আবারও নীলুর কথা ভাবতে শুরু করেছি । সকালবেলাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে ওর কথা আর ভাববো না । কিন্তু দুপুর গড়াতে না গড়াতেই ওর কথা আবার ভাবতে শুরু করেছি । আসলে সব দোষ এই হতচ্ছাড়া বৃষ্টিটার । সেই দুপুর বেলা থেকে একভাবে ঝড়েই যাচ্ছে ।
আর আমার কেবল মনে হতে লাগল ঐ বৃষ্টিটা আমাকে মুখ ভেঙ্গিয়ে বলছে আমি তোমার খুব প্রিয় একজনের খুব প্রিয় ছিলাম ।
আমি চোখ ফিরিয়ে নেই । ঘরের সব জানালা বন্ধ করে দেই । আমি বৃষ্টি দেখবো না । ফুল ভলিউমে টিভি ছেড়ে দেই । বৃষ্টির শব্দও আমি শুনতে চাই না । আমি এমন কিছু করতে চাই না যা আমাকে নীলুকে মনে করিয়ে দেয় । আমি ওকে মনে করতে চাই না ।
কেন মনে করবো ওকে ? যে আমাকে একা রেখে চলে গেছে তার কথা আমি কেন মনে করবো ? আমি মনে করবো না । সোফার উপর বসতে ইচ্ছা হয় না । সবুজ কার্পেটার উপর শুয়ে পড়ি ।
নীলু খুব শখ করে এই কার্পেটটা কিনেছিল । নষ্ট হয়ে যাবে বলে বসার ঘরে এটা বিছায় নি । সোবার ঘরটাতে বিছিয়েছিল । প্রথম যেদিন কার্পেটটা পাড়ে নীলুর আনন্দ দেখে কে !!
বাচ্চা মেয়ে দের মত খুশিতে ওর চোখমুখ আনন্দে ভরে ছিল । আমার হাত চেপে ধরে বলল
-দেখো না কি সুন্দর লাগছে ! মনে হচ্ছে সবুজ একটা মাঠে চলে এসেছি ।
আমি এখন ভাবছি অন্য কথা । আমি তখন আসসোস করছি এতোগুলো টাকা বেড়িয়ে গেল বলে ! অবশ্য আফসোসের খুব বেশি কারন ছিল না । আমার নিজের টাকা না বাপের টাকা । তবুও নতুন সংসারে এখনও কতকিছু কেনা বাকি ! আগে ব্যাচেলার ছিলাম তাই কোন ব্যাপার ছিল না ।
-কই বল না কেমন ?
-ভাল কিন্তু একটু বেশি বিলাশিতা হয়ে গেল না ?
নীলু মুখ একটু মলিন হল ।

আরে দুর ! যত চাচ্ছি ওকে ভাববো না তত ওর ভাবনা চলে আসছে । আমি সবুজ কার্পেট থেকে বিছানায় উঠে এলাম । ওর কথা কিছুতেই ভাববো না । আমি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করি । ঘুমালে হয়তো ওর ভাবনা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবো ।

-কি করছ ?
নীলুর কণ্ঠ । কিন্তু ওর কন্ঠ কিভাবে আসবে ? নিশ্চই আমার কল্পনা ।
-কিছু করছি না ।
নীলুর হাসির শব্দ শুনতে পেলাম ।
-সত্যি কিছু করছো না ?
-না । তোমার সাথে কোন কথা নাই । তুমি চলে যাও ।
-বাব্ব বাহ আমার উপর রাগ করছ ?
-হুম । রাগ করেছি ।
নীলু আবার হেসে উঠল ।
-হাসছো কেন ?
হাসি মিশ্রিত কণ্ঠ নীলু বলল
-তুমি আমার উপর রাগ করতেই পারবে না । সেই ক্ষমতা তোমার নেই ।
কোন জুটসই জবাব না পেয়ে বলল
-তাহলে তুমি আমাকে ছেড়ে কেন চলে গেল ?
-কই গেলাম ? এই তো আমি তোমার কাছে । তোমার সাথে কথা বলছি ।
-না তুমি বলছ না । তুমি আমার কল্পনা ।
-আচ্ছ ? তাই ?
নীলু আবার হেসে উঠল । বলল
-আচ্ছা তুমি যা বল তাই । এখন চল বাইরে খুব সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে । চল না একটু ভিজি ! চল না !
বৃষ্টির কথা উঠতেই আমি ভিজতে গেলাম । কিন্তু নীলুকে কোথাও দেখতে পেলাম । নাম ধরে ডাক দিলাম । কিন্তু ও কোন জবাব দিল না ।
ওর নাম নিতে নিতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল । পুরো ঘর কেমন অন্ধকারে ছেয়ে আছে । টিভি চলছিল । এখন বন্ধ । বাইরে এখনও বৃষ্টি পড়ছে তুমুল বেগে । আওয়াজ আসছে । কারেন্ট চলে গেছে বোধহয় ।
বাধ্য হয়েই জানালা খুলে দিলাম । বাইরে এখনও বৃষ্টি পড়ছে ।
আমার নীলুর পছন্দের বৃষ্টি !

ঐ দিন পর নীলু পরপর দুদিন ক্লাসে আসল না । তৃতীয় দিন একটা টিউটিরিয়াল ছিল । ঐ দিন নীলুকে আবার দেখলাম । কিন্তু চেহারার একি অবস্থা ? ও কাছে এসে ওর খাতা পত্র চাইল । দিতে গিয়ে বললাম
- চেহারার একি অবস্থা ? শরীর খারাপ নাকি ?
নীলু শুকনো মুখে বলল
-একটু জ্বর ।
বই গুলো নিয়ে ও ঘুরতে যাবে ঠিক এমন সময় ও কেমন জানি দুলে উঠল । আমি না ধরলে হয়তো মাথা ঘুরে পরে যেত । ওর গায়ে তখন আকাশ পাতাল জ্বর ।
-একি তোমার গায়ে তো খুব জ্বর !
নীলু আবার শুকনো মুখে বলল
-একটু জ্বর । আমাকে একটু বেঞ্চে বসিয়ে দিবে প্লিজ ।
-তোমার গায়ে খুব জ্বর । এখন বসতে হবে না । ডাক্তারের কাছে চল আগে ।
-এখন পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে । আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না । তুমি পরীক্ষা দাও ।
-আরে এরকম টিউটিরিয়াল আরো হাজারটা আসবে । আগে ডাক্তারের কাছে চল ।

ওকে একপ্রকার জোর করেই ক্যাম্পাসের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম । টিউটিরিয়াল দেওয়া হল না । ডাক্তারের কাছ থেকে যখন বের হয়েছি এখন ওর অবস্থা আরো খারাপ । কেমন যেন লাগছিল । ওকে এই অবস্থা ছেড়ে আসতে কেন জানি মনে চাচ্ছিল না । ও বলল
-আমাকে একটু হলে রেখে আসবে ?
-হুম । কোন হলে থাকো ?
ও হলের নাম বলল ।
-তোমার রুম মেইট আছে এখন রুমে ?
নীলু একটু হাসল ।
-আছে । অন্তত ১০০ আছে ।
-মানে কি ?
-আমি গন রুমে থাকি ।
-ও মাই গড ! এ অবস্থায় তো তোমাকে গনরুমে রাখা যাবে না । ঢাকায় কোন আত্মীয় আছে তোমার ?
-নাহ ।
-তাহলে ?
-তাহলে কিছু না । আমাকে হলেই রেখে আসো ।
-না । তুমি আমার সাথে চল ।
-কোথায় ?
-আমার বাসায় চল ।
নীলু আমার দিকে তাকাল । কি যেন ভাবল ? তারপর বলল
-তোমার বাসায় সমস্যায় হবে না ? মানে আমি একটা মেয়ে !
-কোন সমস্যা নাই । আমি ফ্লাট ভাড়া করে থাকি ।
ও আর কথা বলল না । অবশ্য ওর সে অবস্থা ছিলও না । নীলুকে বাসায় নিয়ে আসলাম ।
মোটামুটি পাঁচ দিন ওর অবস্থা বেশ খারাপ ছিল । একবার ভাবলাম হাসপাতালে নিয়ে যাই । আবারও ডাক্তার ডেকে আনলাম । পাঁচদিন পর ওর জ্বর ছেড়ে গেল ।
ঐ দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি নীলু রান্না ঘরে রুটি বানাচ্ছে । আমি অবাক হয়ে বললাম
-কি করছ তুমি ?
নীলু খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল
-রুটি বানাচ্ছি । দেখছ না ?
-দেখতে তো পাচ্ছি । কিন্তু কেন করছ ?
-আশ্চর্য মানুষ রুটি কেন বানায় ? খাওয়ার জন্য !
-আরে বাবা তুমি কেন করছ ? তোমার শরীর খারাপ । তোমার বিশ্রাম নেওয়ার দরকার । আর কাজ করার জন্য বুয়া তো আছে । একটু পরই চলে আসবে ।
নীলু হাসল ।
-অনেক বিশ্রাম করেছি । আর কত ? তাছাড়া জ্বর নেই ।
আমি খুব স্বাভাবিক ভাবে ওর কপালে হাত দিলাম জ্বর দেখার জন্য । আসলেই জ্বর নেই ।
ওর কপাল থেকে হাত সরিয়ে নেবার সময় ওর চোখে চোখ পড়ল । ঠিক তখনই আমার মনের মধ্যে কেমন জানি একটা অস্বস্তি হল ।
আমি কিভাবে এতো সহজে ওর গায়ে হাত দিয়ে ফেল্লাম ? এই পাঁচ দিনে তো কতবার ওর জ্বর মেপেছি, একবারও এই অস্বস্তিটাতো আসে নি ! তাহলে এমন কেন অস্বস্তি লাগছিল ?
আমার জানা নেই । ওকে ওভাবে রুটি বানানো অবস্থায় দেখে আমার মনে আরো অদ্ভুদ একটা অনুভূতি হল ।
নাস্তা খাওয়ার সময় অনেক কথা হল ওর সাথে । বলা চলে ওখান থেকে আমাদের মেলামেশা শুরু হল । তারপর থেকে ওর সাথে অনেক সময় কাটাতে লাগলাম । আমরা সবকিছু শেয়ার করতাম ।


বৃষ্টির বেগ মনে হচ্ছে বেড়েছে । এরকম বৃষ্টি হলে তো কথাই নাই । ওকে কিছুতেই ধরে রাখার উপায় ছিল না । বৃষ্টিতে ও ভিজবেই । আমি জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেই । বৃষ্টির ফোটা আমার হাতে পড়তে লাগল ।
-এভাবে ভিজলে কি হয় ?
নীলুর কথা যেন আবার শুনতে পেলাম ।
-কিভাবে ভিজবো ?
-তুমি মনে হচ্ছে জানো না ? মনে নেই এই ছাদটাতে আমরা একবার বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম !

আমার এই বাসাটা একে বারে ফ্লাট বললে ভুল হবে । তিন ইউনিটের বাড়িতে বাড়িওয়ালা কেবল এক ইউনিট কোন রকম করে ফেলে রেখেছে । পুরো ছাদটাই বলতে গেলে ফাকা পরে আছে । নীলুর এই ফাকা ছাদটাও অনেক পছন্দ ছিল । ও প্রায়ই আসতো ।
বাচ্চা মেয়েদের মত ছাদে উপর লাফালাফি করতো । একা একা এক্কা দোক্কা খেলতো । আমি হাসতাম কেবল ।
ঐ দিন সকালবেলা আমার বাসায় এসে হাজির । কাঁদে ছোট একটা ব্যাগ । আমি জিজ্ঞেস করলাম
-ব্যাগে কি ?
ও বলল
-শাড়ি । আজ খুব বৃষ্টি হবে । শাড়ি পরে বৃষ্টিতে ভিজবো আজ ।
কেমন যেন একটু অন্য রকম লাগছিল ওকে । বুয়া আসলেও ওকে বিদায় করে দিল । দুপুরের রান্না ও নিজেই করল । দুপুরের দিকেই বৃষ্টি আরাম্ভ হল । আমি জানালার পাশে দাড়িয়ে বৃষ্টি দেখছি এমন সময় নীলু এসে হাজির । ওকে দেখে একটু অবাক হলাম । এর আগে কখনও ওকে শাড়িতে দেখি নি ।
কালো ব্লাউজের সাথে কালো শাড়ি আর কপালে কালো বড় একটা টিপ । আমি খানিকটা সময় ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম এক ভাবেই । নীলু একটা কালো পাঞ্জাবী আমার দিকে এগিয়ে বলল
-নাও এটা পর ।
-কার এটা ?
-তোমার জন্য কিনেছি । নাও জলদি পরো এখন । আজ তোমার সাথে আমি বৃষ্টিতে ভিজবো ।
কালো পাঞ্জাবী পরে বৃষ্টি নেমে পড়লাম । বৃষ্টির ফোটা গুলো কেমন সিরসরে অনুভূতি জাগাচ্ছিল মনে । কালো শাড়ি পরা নীলু আমার আগে আগে হাটছিল । একটা সময় আমার কাছে এসে আমার হাতটা ধরল । আমার দিকে তাকাল গভীর ভাবে ! নীলুর ঐ গভীর দৃষ্টিতে কি ছিল জানি না আমার পুরো পৃথিবীটা যেন এলো মেলো হয়ে গেল ।
সেদিন ঠিক কি করেছিলাম আমার আজও ঠিক মনে পড়ে না । কি এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম ।
কেবল এই টুকু মনে আছে ওকে খুব গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরেছিলাম । আর পাগলের চুম খেয়েছিল ওকে ! বৃষ্টির জলে যেন দুজন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলাম ।

-কি হল ভিজবে না বৃষ্টিতে ?
-না ভিজবো না ।
-কেন ? চল না একটু বৃষ্টিতে ভিজি !
-তুমি ভিজো ।
-তুমি না ভিজলে আমি কিভাবে ভিজি ?
-সেদিন কিভাবে ভিজেছিলে ?
হঠাৎ আমার কন্ঠস্বর তীব্র হয়ে ওঠে ।
-কেন সেদিন ভিজেছিলে ?
আমি আবার জানতে চাই চিৎকার করে ।
কোন জবাব আসে না ।

নীলুকে তার কিছুদিন পরেই বিয়ে করে ফেলি । ওকে আর কিছু ভাল লাগতো না তখন । একটা পলক না দেখলে কেমন জানি অস্থির লাগতো । বিয়ের পর আমাদের জীবনটা আরো সুন্দর হয়ে ওঠে । দুজন দুজনকে একটা পলকের জন্য চোখের আড়াল করতাম না ।
একসাথে ভার্সিটি যেতাম একসাথে আসতাম । একসাথে খেতাম , একই প্লেটে খেতাম , গোসল করতাম একসাথে বিকেল হলে ওর সাথে ছাদে ছোটা ছুটি করতাম ।
ওর ছেলেমানুষী যেন আরো বেড়ে গেল । আগে বৃষ্টি হলেতো কেবল ও একা ভেজার জন্য লাফাতো তখন আমাকেও ভিজতে হত ওর সাথে ।
বৃষ্টির প্রতি এমন পাগলামো দেখে মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম । বিরক্ত হওয়ার প্রধান কারন টা হল প্রত্যেকবার বৃষ্টি ভেজার পরই ওর জ্বর আসতো । মাঝে মাঝে তো জ্বর গায়ে নিয়েও বৃষ্টিতে নেমে পড়ত । তখন খুব চিৎকার চেচামেচি করতাম । কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হত না ।
ঐ দিন ঠিক একই কাজটা করেছিল । নীলুর গায়ে আগে থেকেই দুদিনের জ্বর ছিল । রাত তখন বারটা কি সাড়ে বারটা হবে । সারাদিন ক্লাস নিয়ে বেশ ব্যস্ত ছিলাম । বিকেল বেলা আবার নীলুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে ছিলাম । ডাক্তার বৃষ্টিতে ভিজতে সাফ মানা করে দিয়েছে ।
তবুও নীলু আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলল
-এই বাইরে না খুব সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে । চল না একটু বৃষ্টিতে ভিজি !
ওকে ধমক দিলাম । ডাক্তার কি বলেছে মনে করিয়ে দিলাম । চুপচাপ ঘুমাতে বলে নিজেও ঘুমিয়ে পড়লাম ।
সকাল বেলা বাথরুমে ভেজা কাপড় দেখে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম । তারমানে রাতের বেলা ও আমাকে না জানিয়েই বৃষ্টিতে ভিজেছে । মেজাজটা খারাপ হল ।
নীলুকে বকার জন্য শোবার ঘরে গিয়ে দেখি নীলু প্রায় অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পরে আছে । ওর গায়ে আকাশ পাতাল জ্বর ।
কি করবো কিছুই বুজতে পারছিলাম না । জ্বল পট্টি দিয়েও কাজ হচ্ছিল না ।
জ্বর কমছিল না কিছুতেই । উপায় না দেখে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম । স্ট্রাচারে যখন ওকে আইসিইউতে নিয়ে যাচ্ছিলাম তখন অল্প ক্ষনের জন্য ওর হুস ফিরেছিল । আমি তখন ওর হাত ধরা । ও ফিসফিস করে বলল
-আমার উপর রাগ রেখো না কেমন ! তোমার কথা শুনিনি বলে আমার উপর রাগ রেখো না ।
-তোমার উপর কখনও রাগ করেছি আমি বল ?
-তুমি ভাল থেকো ।
আমি আর কথা বলতে পারলাম না । নার্সরা ওকে আইসিইউ এর মধ্যে নিয়ে গেল । আমি শেষ বারের মত ওর চোখে জল দেখতে পেলাম ।

- কই চল । বৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে তো ?
-আমি ভিজবো না ।
-প্লিজ চল না !
আমি চুপ করে থাকি । কেন জানি আমার কান্না আসে !
-কই চুপ করে আছো কেন ? চল ! ঐ কালো পাঞ্জাবীটা পরো । কাবাডের বাম পাশের ড্রায়ারে আছে ।
ওকে কথা দিয়েছিলাম ওর উপর রাগ করে থাকতে পারি না । ও ভাল থাকতে বলেছিল কিন্তু আমি ভালও থাকতে পারছি না ওকে ছাড়া ।
আমি কালো পাঞ্জাবীটা পরে নিই । বৃষ্টির ফোটা আমার মনে আজও কেমন একটা শিহরন জাগায় ! যেন ও এখনও আমার পাশে বৃষ্টিতে ভিজছে । ওর খুব পছন্দের বৃষ্টি ।

সুন্দর সেই ভালবাসার দিনটির জন্য অপেক্ষা

 

সুন্দর সেই ভালবাসার দিনটির জন্য অপেক্ষা

কথাটা বলেই শ্রাবণীর মনে হল কি করলাম ! ও তো এখন মন খারাপ করবে । এমন ছোট ছোট কথাতে ছেলেটা মন খারাপ করে ! কিন্তু ছেলেটা কে তো দোষও দেওয়া যায় না । ও তো আর অন্য কেউ না । ওর একটু রুক্ষ আচরনে তো মন খারাপ হবেই । এখন কি করা যায় । শ্রাবণী খুব ভাল করে জানে এখন যদি ও এভাবেই ফোন টা রেখে দেয় তাহলে অপু সারারাত মন খারাপ করে থাকবে । কথার শুরুতে বলেছিল যে এখনও ভাত খাওয়া হয় নি , ফোন রেখে দিলে ভাত না খাওয়ারও সম্ভাবনা আছে । অপুর এই এক দোষ । যদি শ্রাবণীর কোন কথাতে বা আচরনে ও কষ্ট পায় ওকে কিছু বলবে না । নিজেকে কষ্ট দেবে । শ্রাবণী খুব বিরক্ত হয় ওর এই আচরনে । বলে 'তুমি এমনটা কেন কর । আমি যখন তোমাকে কষ্ট দেই তুমি আমাকে কষ্ট দিতে পার না?? নিজেকে এভাবে কেন কষ্ট কেন দাও ?'
অপু হাসে । বলে 'তুমি আমার একটা মাত্র টিয়াপাখি ।তোমাকে কিভাবে কষ্ট দেই বল?'
শ্রাবণীর চোখে পানি এসে যায় । এই কথা গুলো খুব ভাল লাগে । তখন নিজের উপর খুব রাগ । এমন একটা মানুষকে কিভাবে ও কষ্ট দেয়? মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এমন টা আর করবে না । কিন্তু তবুও হয়ে যায় । ওর রাগটা এতো বেশি ! যখন মেজাজ খারাপ থাকে তখন কাকে যে কি বলে হুশ থাকে না ।
শ্রাবণী বলল
-কি হল চুপ করে গেলা কেন ? কথা বল ।
-তোমার যখন কথা বলতে ভাল লাগছে না তখন ফোন রেখে দেই ?
-ভাল করে বল ।
-ভাল করেই তো বলছি । আম কি কখনও তোমার সাথে খারাপ করে কথা বলেছি ?
শ্রাবণীর খুব মায়া লাগে । কথাটা খুব সত্যি । শ্রাবণী অপুর সাথে যত খারাপ ব্যবাহরই করুক না কেন অপু কখনও ওর সাথে একটা উচু স্বরে কথা বলে না ।
শ্রাবণী বলল
-আমি ঐ খারাপের কথা বলি নি । ভাল করে বল মানে বুঝিয়েছি একটু হেসে বল । প্রতিদিন ফোন রাখার সময় যেমন করে বল সেভাবে বল ।
-ওভাবেই তো বলছি ।
-না ওভাবে বলছ না । হেসে বল ।
শ্রাবণী ধমক দিয়ে ওঠে । তারপর একটু নরম স্বরে বলল
-প্লিজ একটু হেসে বল । আমি জানি এখন যদি তুমি মন খারাপ করে ফোন রেখে দাও সারারাত তোমার মন খারাপ থাকবে । কালকেও তোমার মন খারাপ থাকবে । বল এটা কি আমার ভাল লাগবে ?
-আচ্ছা বাবা আমি মন খারাপ করবো না । কথা দিলাম ।
শ্রাবণীর একটু ভাল লাগে । অপু যখন ওকে কোন কথা দেয় তা ও সবসময় রাখে । শ্রাবণী বলল
-তুমি বাচ্চা ছেলেদের মত কেন অল্পতে কষ্ট পাও বলতো ? মানুষের সব দিন কি সমান যায় । একটু তো উনিষ-বিশ হয়েই যা্য় ! এতো মন খারাপ করলে কি চলে ? আজ সেই সকাল বেলা বাসা থেকে বের হয়েছি । মাত্র আসলাম । সারাদিন ক্লাস ট্রেনিং স্যারদের বকবকানি এসব করে যখন বযসায় আসি মন মেজাজ কি ঠিক ঠাকে বল ?
-আমি তো বুঝি । কিন্তু কি করব বল? তোমার দিক থেকে আসা একটু খানি ভালবাসা আামকে যে কি পরিমান আনন্দ দেয় তোমাকে বলে বলে বোঝাতে পারব না । ঠিক তেমনি একটু কঠিন কথা খুব ক|ষ্ট দেয় ।
শ্রাবণীর নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হয় । যত যাই কিছু হক কই অপুতো কখনও ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করে না । তাহলে ও কেন করে ? কেন এমন টা করে । অপু বলল
-জানো আমার কি মনে হয় ?
-কি মনে হয়?
-না শুধু মনে হয় না এটা আমার বিশ্বাস যে এমন একটা দিন আসবে যে দিন তুমি চাইলেও আমার সাথে খরাপ ব্যবহার করতে পাবে না । শুধু আমাকে ভালই বাসবে । আমি সেই সুন্দর ভালবাসার দিনটার জন্য অপেক্ষা করি ।
শ্রাবণী লক্ষ্য করল আপনাআপনি ওর চোখে পানি চলে এসেছে । এমন ভাবে কেন অপু ওকে ভালবাসে ! কেন ?
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে অপুকে আর কখনও কষ্ট দেবে না । ওর সাথে আর একটুও খারাপ ব্যবহার করবে না ।