আজ দুইদিন ধরে পৃথিশার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি । ওর সামনে পড়তে চাচ্ছি না । কেমন জানি একটা অস্বস্তি খেলা করছে বুকের ভিতর । কি সহজ সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিল ওর সাথে আর এখন কেমন জানি হয়ে গেল । হয়তো কিছুই হয় নি কিন্তু নিজের কাছে কিছুতেই সহজ হতে পারছি না । স্যার ঢোকার পরপরই ক্লাস রুমে ঢুকেছি তাই পৃথিশা কথা বলার সুযোগ পায় নি । এখন স্যার ক্লাস রুম থেকে বেরোনোর সাথে সাথে বের হয়ে যেতে হবে যাতে পৃথিশা আমাকে ডাকার সুযোগ না পায় । কিন্তু যেমনটি ভাবলাম তেমনটি হল । ক্লাস রুম থেকে বের হতে যাবো ঠিক এমন সময়ই পেছন থেকে ডাক শুনতে পেলাম -এই আবির । দাড়া বলছি । পৃথিশা ডাকছে । ডেকে যখন ফেলেছে দাড়াতেই হল । আমার সামনে এসে বলল -মোবাইল হারিয়ে ফেলছিস ? -মোবাইল হারাবো কেন ? -কাল আর পরশু মিলে কত বার ফোন দিয়েছি ? আমি হিসাবটা জানি । পরশু দিন থেকে ও কম করে হলেও সত্তর বার ফোন দিয়েছে । মেসেজও পাঠিয়ে অনেক গুলো । আমি ধরি নি । বলতে গেলে ধরতে পারি নি । অস্বস্তির জন্য । -সাইলেন্ড ছিল তো বুঝতে পারি নি । -পরে তো দেখেছিস । ব্যাক করিস কেন ? -আসলে ........ -থাক মিথ্যা কথা বলতে হবে না । আমি দুদিন ধরে দেখছি তুই আমাকে এড়িয়ে চলছিস । কারনটা বলবি ? -কই না তো এড়িয়ে চলছি না তো । এড়িয়ে চলবো কেন ? আশ্চর্য । -আমার সাথে মিথ্যা কথা বলার ট্রাই করিস না । এখন পালাচ্ছিলি কেন ? -পালাবো কেন আশ্চর্য ? -আমি তোর বিহেবিয়ার খুব ভাল করে জানি । তুই যখন কিছু লুকাতে চাস তখন তুই কথার শেষে বারবার আশ্চর্য লাগাস । আর তোর নাক ঘামতে থাকে । কথা সত্য । নাকে হাত দিয়ে দেখলাম সত্যি নাক ঘামতেছে । -না সত্যি এখন আমার একটা জরুরী কাজ আছে । এখনই যেতে হবে । মনে হল না যে পৃথিশা আমার কথা বিশ্বাস করেছে । বলল -ঠিক আছে যা । তবে বিকাল বেলা দেখা করবি । আমি বলতে যাচ্ছিলাম টিউশনি আছে কিন্তু আমার বলার আগেই পৃথিশা বলল -আমি জানি আজ তোর টিউশনি নাই । তারপর কি মনে হল পৃথিশা আমার আর একটু কাছে এসে দাড়াল । আমার হাতটা ধরে বলল -আমার হাত ছুয়ে কথা দে যে দেখা করবি । বল । আমি অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলাম । ওর চোখের দিকে তাকাতেই অস্বস্তিটা আরো বেড়ে গেল । কি গভীর চোখেই না ও তাকিয়ে আছে আমার দিকে । এই দৃষ্টিটা আমার একদমই পরিচিত নয় । -আচ্ছা আমি কথা দিলাম । আসবো । পৃথিশা ক্লাস রুমের ভিতরে চলে গেলো । আমি পালালাম ওখান থেকে ।
বলতে গেলে পৃথিশা আমার সব থেকে ভাল বন্ধুদের একজন । একজন বলছি কেন ও ই সব থেকে ভাল বন্ধু আমার । ওর সব থেকে যে দিকটা আমার ভাল লাগে সেটা ও সব কিছু সোজা সুজি বলে । কোন ঘুরিয়ে পেচিয়ে না । একজনকে ওর পছন্দ না সরাসরি বলবে যে পছন্দ না । কথা ঘোরাবে না । আর ও কোন কিছুতে লুকোছাপা করতো না । একটু এক গুয়ে । যা একবার বলবে তা করবেই । এমন একটা মেয়ের সাথেই ছিল আমার বন্ধত্ব । ওর সাথে সময় বেশ ভালই কাটছিল । আমাদের সম্পর্কটা বেশ সহজ আর স্বাভাবিক ছিল । আমরা একসাথে পড়তাম খেতাম ঘুরতাম গল্প করতাম । কি চমৎকারই না দিন কাটছিল ! কিন্তু সব কিছু কেমন পরিবর্তন হয়ে গেল দুদিন আগে । দুদিন আগে ওর সাথে সোঁনার গায়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম । আমাদের প্লান ছিল বিকালের মধ্যেই ফেরত্ আসবো । সোঁনার গা দেখার পর আমরা পাশের একটা গ্রামের পথ ধরে হাটছিলাম । সত্যি বলতে ওর সাথে হাটতে খুব ভাল লাগছিল । পৃথিশাকে হাসি খুশি লাগছিল । কিন্তু হঠাত্ ওর মুখটা কালো হয়ে গেল । আমি বললাম -কি হল ? তোর মুখটা ওমন কেন হয়ে গেল কেন ?? ও আকাশের দিকে ইশারা করে বলল মেঘ জমছে । -তো কি হয়েছে ? আমরা গ্রামের কোন ঘরে আশ্রয় নিয়ে নেবো । সমস্যা কি ? -না না চল । জলদি চল । -কেন ? দেখ না কি চমৎকার একটা আবাহাওয়া । আর একটু থাকি না ? কিন্তু পৃথিশার চেহারায় কেমন জানি একটা অস্বস্থিরতা দেখতে পেলাম । ও বারবার বলতে লাগল -চল আবির । প্লিজ চল । আর থাকা গেল না । ওকে নিয়ে রওনা দিলাম । কিন্তু এতো দ্রুত সারা আকাশ কালো হয়ে গেল যে আমরা খুব বেশি যেতে পারলাম না । পুরো আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল । আর বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল । বাধ্য হয়ে একটা বড় বটগাছের নিচে দাড়াতে হল । একটু পর খুব জোড়ে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো । আমি অবাক হয়ে দেখলাম পৃথিশা কেমন জানি ভয় পাচ্ছে । প্রতিটা বর্জ্যপাতের সাথে ওর চেহারায় কেমন একটা ভয়ে চিহ্ন দেখা দিচ্ছে । বাচ্চা মেয়ে মত ভয়ে কুড়রে উঠছে ও । আমি ওর হাত ধরলাম । -কি হয়েছে পৃথু ? এমন করছিস কেন ? ঠিক তখনই খুব জোড়ে বাজ পড়ল । পৃথিশা এতোই ভয় পেলো যে আমাকে জড়িয়ে ধরল । এতো জোড়ে জড়িয়ে ধরল যে আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগা আরাম্ভ করল । প্রতিবার বাজ পড়ছিল আর ও আরো একটু একটু করে আমাকে জড়িযে ধরছিল । কি করবো ঠিক মাথা কাজ করছিল না । তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম যে ও বর্জ্যপাতে ভয় পাচ্ছিল । আমার জড়িয়ে ধরে ও আশ্রয় খোজার চেষ্টা করছিল । যতক্ষন আকাশে মেঘ ডাকছিল ও আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল । তবে শেষের দিকটা ওর ভয় পাওয়ার মাত্রটা একটু কম ছিল । মেঘ ডাকা কমে গেলে আমরা ঢাকা দিকে ফিরে আসি । পুরো রাস্তা ধরে ও এক দম চুপ করে থাকল । আমার হাতটা একটা বারের জন্যও ছেড়ে দেয় নি । মনে হচ্ছিল যেন বাচ্চা একটা মেয়ে । কোন কিছু দেখে ভয় পাচ্ছে । তাই আমার হাত ধরে রেখেছে । ওকে হলে পৌছে দিলাম কিন্তু আমার মনের ভিতর একটা অস্বস্তি রয়েই গেল । বার বার ঐ সময়ের কথা আমার মনে পরছিল । পৃথিশা কিভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল । এই অনুভুতিটা আমি কিছুতেই মুছে ফেলতে পারছি না । তাই বিকেল বেলা যখন ওর সাথে দেখা হল খুব অস্বস্তি লাগছিল ।
আমি বসে ছিলাম জারুল গাছটার নিচে । পৃথিশা কেমন এলোমেশো পা ফেলে এগিয়ে আসছিল । কিছু একটা ভাবছিল । কাছে আসতে ওকে বললাম -কেমন আছিস ? কেন জানি ওকে তুই করে বলতে একটা কষ্ট হচ্ছিল । -ভাল । পৃথিশা হাসল । আমার কাছে এসে বসল । কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থাকল । একসময় বলল -কিছু বলছিস না কেন ? -কি বলব ? তুই না বললি কি যেন বলবি । পৃথিশা আরো কিছুক্ষন চুপ করে থাকল । তারপর হঠাৎ করে বলল -তুই খুব অবাক হয়ে ছিলি না ? - হুম ? কি বললি ? -ঐ দিন যে তোকে জড়িয়ে ধরেছিলাম । অবাক হয়েছিলি ? -একটু হয়েছিলাম । -এই জন্য আমার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলি ? -পালাবো কেন ? আশ্চার্য ! পৃথিশা হেসে ফেলল । -তুই আসলেই একটা গাধা । ঠিক মত মিথ্যা কথাও বলতে পারিস না । আমি কিছু বললাম না । ও আবার বলল -জানিস আবির আমি মেঘ ডাকা খুব ভয় পাই । সেই ছোট বেলা থেকে । এতো ভয় লাগে আমার । এই জন্য তোকে জড়িয়ে ধরেছিলাম । ভয়ে । -ঠিক আছে সমস্যা নাই । -জানিস আগে এতো ভয় পেতাম । মাঝে মাঝে তো অজ্ঞান হয়ে যেতাম । -এতো ভয় কেন পাস ? -জানি না । -ওকে সমস্যা নাই । চল কিছু খাওয়া যাক । আমি উঠে দাড়ালাম । -আবির বস । আমি এখনও কথা শেষ করি নি । আমি আবার বসে পড়লাম । ও বলল -আমি সারা জীবন মেঘ ডাকাকে এতো ভয় পেয়েছি তোকে কিভাবে বোঝাবো ? কিন্তু সেদিন যখন তোকে জড়িয়ে ধরেছিলাম প্রথম প্রথম খুব ভয় লাগছিল । কিন্তু একটা সময় এসে আমি লক্ষ্য করলাম আমার আর ভয় লাগছে না । আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম । তোমার বুকে আমি নিজেকে এতো নিরাপদ বোধ করছিলাম যে তোকে বলে বোঝাতে পারবো না । পৃথিশা চুপ করে থাকল কিছুক্ষন । আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না । -আবির ? -হুম । আমি পৃথিশার দিকে তাকালাম । ওর ঠোট দুটো কাঁপছে । কিছু যেন বলতে চাইছে । কিন্তু বলতে পারছে না । ওর চোখ দুটো নির্বাগ চাহনিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । চোখের ভিতে পানি জমতে শুরু করেছে । আমি হঠাৎ করে বুঝে ফেললাম ও কি বলতে চায় । হঠাৎ করে সেই অস্বস্তিটা চলে গেল । ওখানে কেমন যেন একটা ভাল লাগা আমার পুরো মন কে স্পর্শ করল । ওকে বললাম -তোকে কিছু বলতে হবে না । ওর হাত দুতো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম -আমি সব সময় তোর পাশে থাকবো ।
পৃথিশার চোখ দিয়ে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়ল । আমি সেই অদ্ভুদ ভাল লাগা অনুভূতি নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম ।
অননিতা যখন এস্টেটার গেটের সামনে দাড়াল তখন বিকেল ছুই ছুই করছে । রোদ আছে কিন্তু রোদের তেজ অনেকটা কম । অবনিতা নামটা আবার পড়ল । মামুন এস্টেট । অননিতা আরো একবার ঠিকানা টা মিলিয়ে নিল । হুম এটাই সেই জায়গা । গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই একটা লোক এগিয়ে এল । পোষাক দেখে মনে হল দারোয়ান হবে হয়তো । -কার কাছে যাইবেন ? -এখানকার এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মাহাফুজ করিম , ওনার বাংলাটা কোন দিকে বলতে পারেন ? দারোয়ান গোছের লোকটা প্রথমে কি যেন ভাবল । কিছু যেন মনে করার চেষ্টা করছে । অননিতার ভয় হল হয়তো লোকটা বলবে মাহাফুজ করিম নামে এই চা বাগানে কেউ চাকরী করে না । -আবির স্যারের কতা বুলছেন ? অননিতার জানে পানি এল । এতো দিন পর আবিরকে খুজে পাওয়া গেল । -হ্যা । আবির । আমি ওর ওয়াফ । মানে স্ত্রী । লোকটা হাসল । -মেমসাব ওয়াপের মানে জানা আছি । লোকটা আবার হাসল । -আপনি একটু খাড়ান আমি ভ্যান লিয়ে আসছি । সারের বাংলো একে বায়ে শেষ মাথায় । লোকটা বেশ সাহায্য করল । নিজেই ভ্যান নিয়ে এল । ব্যাগটাও অননিতাকে তুলতে দিলো না । বলল -আপনে আবির সারের ওয়াইপ । আপনাকে ব্যাগ তুলবেন আর হামি চাইয়ে চাইয়ে দেখমু তা হবি না । ভ্যানটা যখন এস্টেট টার মাঝ খান দিয়ে যাচ্ছিল অননিতা চারিপাশে তাকিয়ে দেখছিল । চারি পাশে কি শান্তির একটা ছায়া রয়েছে । আবিরের সব সময় এমন একটা চা বাগানে চাকরি করার স্বপ্ন ছিল । ওর আগেই বোঝা উচিত্ ছিল । তাহলে আরো আগে ওকে খুজে পাওয়া যেত । গত কাল তুহিন যখন ফোন করে আবিরের ঠিকানাটা দিল ওর প্রথমে বিশ্বাসই হয় নি । প্রায় দুইমাস ধরে আবির গায়েব । কোন খোজই পাওয়া যাচ্ছিল না । অননিতা কোথায় খোজ করে নি ? প্রথমে ভেবেছিল হয়তো আবির ওর গ্রামের বাড়ি গিয়েছে । কিন্তু না । ওখানে সে যায় নি । তারপর ওর যত বন্ধুবান্ধব আছে সবার বাসায় ও গিয়েছিল । সম্ভাব্য সব জায়গায় ও আবির কে খুজেছে । কিন্তু আবির যেন একেবারেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল । প্রথম প্রথম অননিতার মনে হত আবির হয়তো ওর সাথে ফান করছে । কিংবা ওর উপর অল্প স্বল্প রাগ করেছে । রাগ পড়ে গেলেই চলে আসবে । কিন্তু এক সপ্তাহ পরেও যখন আবির এল না তখন অননিতা খুব টেনশনে পড়ে গেল । -এই যে আবির সারের বাংলু । অননিতা ভ্যান থেকে নেমে পড়ল । লোকটাকে টাকা দিতেই লোকটার ৩২টা দাঁত আনন্দে বের হয়ে গেল । বাংলোর সিড়ি পর্যন্ত ওর ব্যাগ পৌছে দিল । বাংলোটা বেশ সুন্দর । সিমসাম ছোট । অননিতার মনটা ভাল হয়ে গেল । একে তো আবিরকে পাওয়ার আনন্দ তার উপর এতো সুন্দর একটা পরিবেশ । অননিতার মনে হল আজকের দিনটা ওর জন্য খুব আনন্দের । বাংলোর মেইন দরজা খোলাই ছিল । ওর সারা শব্দ পেয়ে একটা বুড়ো মত লোক বেরিয়ে এল । -কাকে চান ? লোকটা এই প্রশ্নটা করেই খানিক চুপ করে থাকল । ওর চেহারাটার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন । একটু পর বুড়োর মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল । বলল -অনেকটা পথ এসেছেন । ক্লান্ত নিশ্চয় ? আমার সাথে আসেন । -আমি আসলে আবির ....... অননিতা বলতে গেল । বুড়ো মত লোকটা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল -আমি বুঝতে পেরেছি আপনি কে । আমি স্যারের বাবুর্চি । স্যারের সব দেখাশুনা আমিই করি । স্যারের আসতে আরো কিছু সময় লাগবে । আপনি ফ্রেস হয়ে নিন । এইটা স্যারের রুম । অননিতা আর কোন কথা বলল না । তবে একটু অবাক হল । বুড়ো ওকে চিনল কিভাবে ? যাক পরে এক সময় জিজ্ঞেস করতে হবে । অননিতা আসলেই অনেক ক্লান্ত ছিল । সারাটা দিন জার্নির উপরই ছিল । তুহিনের কাছ থেকে খরব পেয়ে ও আর দেরি করে নি একটুও । কোন রকম প্রস্তুতি ছাড়াই চলে এসেছে । ওর কেবল মনে হচ্ছিল যে কোন ভাবেই আবিরের কাছে ওকে যেতে হবেই । ফ্রেস হবার পর ওর ক্লান্তিটা একটু কম মনে হল । বিছানার এসে গা এলিয়ে দিল । চোখ যখনই সিলিংয়ের দিকে গেল একটা ধাক্কার মত খেল ও । পুরো বিছানার সমান বড় একটা পেইন্টিং সিলিংয়ে আটকানো । যেই বিছানায় শোবে সরাসরি চোখ পরবে পেইন্টিং টার দিকে । অননিতা চমকালো । কারন পেইন্টিংটা ওর নিজের । আবির সব সময় ঘুম থেকে উঠে ওর মুখ দেখতে চাইতো । ও বলত আমি যাকে সব চেয়ে ভালবাসি প্রতি দিন যেন তার চেহারা দেখেই আমার ঘুম ভাঙ্গে । এখানেও যেন ঘুম ভাঙ্গার পর আবির ওকেই দেখতে পায় সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে । আর এই জন্য বুড়ো বাবুর্চি ওকে চিনতে পেরেছে । অননিতা একটু চোখ বুজল । আজ প্রায় দুই মাস পর ও যেন একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারছে ।
অননিতা সব সময় একটু উশৃঙ্খল টাইপের ছিল । সব কিছুতেই ওর যা ইচ্ছা তাই করতো । কারো বাধা শুনতো না । কিন্তু অননিতা সব সময় ওর বাবাকে দেখে ভয় পেত । যদি ওর বাবা ওর কোন কাজেই বাঁধা দিতো না কিন্তু বাবার রাগ কে ও খুব ভয় পেত । তাই যখন ওর বাবা ওর বিয়ের জন্য আবির কে নিয়ে এল অননিতা আপত্তি করার সাহসই পায় নি । বিয়ের পর ওরা আলাদা বাসায় উঠে এল । অননিতা আরো আবিষ্কার করল যে আবির খুবই ভাল একটা ছেলে । ও যেন আরো একটু ছাড় পেয়ে গেল । আগে তো বাবা নজর দাড়ি ছিল । তাই কোন কিছু করতে হলে একটু ভয় ভয় করতো । বিয়ের পর সেই ভয়টুকুও রইল না । আবির সারাদিন অফিস করত । সন্ধ্যায় বাসায় এসে ওর সাথে সময় কাটাতো । সারা দিনে কোথায় ছিল কি করছিলে এমন কিছুই জিজ্ঞেস করতো না । মোট কথা অননিতা খুব আনন্দেই ছিল । আর একটা ব্যাপার অননিতা খ্যাল করলে আবিরের সঙ্গ ওর ভাল লাগছে । ও যতই বাইরে বাইরে থাকুক অন্য মানুষের সাথে মিশুক , আবিরের সাথে কাটানো সময় গুলো ওর কাছে বেশ মধুরই মনে হত । সব থেকে বড় কথা অননিতা খুব ভাল করে টের পেত আবির ওকে ভালবাসতে শুরু করেছে । ব্যাপারটা অননিতা নিজেও খুব উপভোগ করত । এভাবেই ওর দিন গুলো কাটছিল কিন্তু একদিন এর স্বন্দ পতন হল । ঐ দিন অননিতার এক বান্ধবীর বাসায় পার্টি ছিল । বেশ রাতই হয়ে গেছিল । বাসায় আসছিল না দেখে আবির নিজেই পার্টিতে হাজির হয় । অননিতা তখন ড্রিংস করায় ব্যস্ত । আবীব মোটামুটি জোড় করেই ওকে বাসায় নিয়ে এল । অননিতা বোধহয় একটু বেশিই ড্রিংস করে ছিল । বাসায় এসেই আবীরের উপর ঝাপিয়ে পড়ল । আবীর কে বলল -তোমার সাহস তো কম না ! তুমি কোন সাহসে আমাকে নিয়ে আসলে ? -অননি আমি তোমার হাসবেন্ড । এই অধিকার আমার আছে । -হাসবেন্ড মাই ফুট । আমার বাপের অফিসে চাকরী করে আমার বাপের তা খেয়ে এমনকি আমার বাপের দেওয়া ফ্লাটে থেকে তুমি কোন সাহসে আমার উপর অধিকার ফলায় । এক্ষনি তুমি বের যাও আমার বাসা থেকে । আমি তোমার মুখ যেন আর না দেখি । অননিতার যদিও হুস ছিল না , তবুও আবীরের কাছে কথা গুলো খুব খারাপ লেগেছিল । ঐ রাতের বেলা ও বাসাতেই ছিল কিন্তু সকাল হতেই ব্যাগ গুছিয়ে ঐ বাসা থেকে বের হয়ে গেল । সকালে অননিতার ঘুম ভাঙ্গলে রাত্রের সব কথা ওর মনে পড়ে যায় । ও ভেবে রাখে যে সন্ধ্যায় আবীর যখন অফিস তখন অফিস থেকে আসবে তখন ওকে সরি বলবে । বেচারা নিশ্চই অনেক কষ্ট পেয়েছে । কিন্তু যখন সন্ধ্যার পরেও যখন আবীর যখন বাসায় আসল না , অননিতার কেমন যেন একটা ভয় করতে লাগল । ওর ভয়টা সত্যি হল যখন বাড়ির কাজের লোকটা বলল যে আবীর সকাল বেলা বড় একটা ব্যাগ নিয়ে বের হয়েছে । অননিতা ভয়তে ওর বাবাকে কিছু বলতেও পারছিল না । ঠিক সাত দিন পর অননিতার বাবা ওকে ফোন করল । ফোনে বলল -কি ব্যাপার আবীর কই ? অননিতা কিছু বলতে পারল না ভয়তে । ওর বাবা বলল -ও আজকে রিজাইন করেছে । ওর মোবাইল ও অফ পাচ্ছি । কি হয়েছে বলত ? অননিতা বলল -আব্বু ও বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে । -কেন বাড়ি ছেড়ে যাবে কেন ? অননিতা বুঝল আর চুপ করে থেকে লাভ নেই । আস্তে আস্তে সব বলে দিল । সব শুনে অননিতা বাবা খুব রাগ করল । অননিতাকে বলল -তুই আবীরকে খুজে কে খুজে আনবি তারপর আমার সামনে আসবি ! এর আগে আমি তোর মুখ দেখতে চাই না । তারপর থেকেই অননিতা ওকে পাগলের মত খুজে বেড়াচ্ছে ।
প্রতিদিনই অফিস থেকে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায় । আবীর চায় আরো ব্যস্ত থাকতে । সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওর সময়টা ভালই কেটে যায় । কাজের মধ্যে ডুবে থাকে । কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে আর সময় কাটতে চায় না কিছুতেই । কেমন যেন সব কিছু থেমে যায় । ও ভাবে নি যে অননিতাকে ও অতো খানি মিস করবে ? মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ দিন ওভাবে চলে না আসলেও তো হত । অননিতা ড্রাঙ্ক ছিল । কি বলতে কি বলেছে ! কিন্তু কথা গুলো ওর ঈগোতে বড় লেগেছিল । অননিতার উপর প্রচন্ড এক অভিমান জন্মে ছিল বুকে । যাকে ভালবাসা যায় তার উপর তো অভিমান করা যায় । সন্ধ্যার কিছু পর কাজ শেষ হল । সারা দিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে । বাসায় গিয়ে একটা ঘুম দিতে হবে । আবীরের কাছে এই চা বাগানের চাকরীরা অনেক আকর্ষনীয় ছিল । আবীর অনেক দিন থেকেই এরকম একটা চাকরীর চেষ্টাই ছিল । ইচ্ছা ছিল এরকম একটা চাকরী হলে অননিতাকে নিয়ে চলে আসবে । তারপর দুজনে মিলে খুব সুন্দর একটা জীবন কাটাবে । কিন্তু অননিতাকে ছাড়া এই আকর্ষনীর চাকরীটা মোটেই খুব বেশি আকর্ষনী মনে হচ্ছে না । এই চা বাগানের সৌন্দর্য আবীরকে খুব আনন্দ দিতে পারছে না । আবীর খুব ভাল করে বুঝতে পারছে ওর সামনের দিন গুলো আরো কষ্ট নিয়ে আসবে । ও বাসার দিকে রওনা দিল । ইদানিং আর একা একা বাইরে বেশি ভাল লাগে না । নিজের শোবার ঘরটাই ওর কাছে এখন ভাল লাগে । যখন ও নিজের বিছানায় শোয় তখন ও অননিতা মুখটা দেখতে পায় । কি যে ভাল লাগে ওর ! বাসার কাছে চলে এসেছে এমন সময় ওর ফোনটা বেজে উঠল । তুহিন ফোন করেছে । -বল । -দোস্ত একটা কাজ করে ফেলেছি । -কি করেছিহ ? -অননিতাকে তোর ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি । আবীর কিছু বলতে গিয়েও বলল না । তুহিন আবার বলল -প্লিজ রাগ করিস না । ও তোর ঠিকানা পাগলের মত খুজতেছিল । খুব অস্থির হয়ে গিয়েছিল । আমি আর না দিয়ে থাকতে পারি নি । প্লিজ কিছু মনে করিস না । আর কত দিন ওর উপর রাগ করে থাকবি ? -আচ্ছা ঠিক আছে । ফোন রাখার পর আবীরের কেন জানি একটু আনন্দ বোধ হচ্ছে । ওর মনে হচ্ছে দু এক দিনের মধ্যে অননিতা ওর এখানে চলে আসবে । ওর এই কথা মনে হতেই খুব ভাল লাগতে লাগল ।
আবীর যখন ওর বাংলোতে পৌছিয়ে তখন বেশ অন্ধকার । বাংলোতে কোন আলো জ্বালানো হয় নি । -এই সগির মিয়া এতো আলসে হয়েছে ! সন্ধ্যার সময় আলোটাও জ্বালাতে মনে থাকে না । বাংলোর সিড়িতে উঠে বলল সগির মিয়া ! লাইট জ্বালাও নি কেন ? সন্ধ্যার ঘরবাড়ি অন্ধকার কেন ? ঠিক তখনই আলো জ্বলে উঠল ।
আবীর খুব চমকে উঠল । ওর ঘরের চৌকাঠের সামনে অননিতা দাড়িয়ে আছে । কেমন চোখ ছলছল চোখে । আবীরের প্রথমে মনে হল ওর হয়তো চোখে ভুল । অননিতা একটুও দেরি করল না সরাসরি ওকে জড়িয়ে ধরল । আবীর কোন কথাই বলতে পারল না । কেবল একটা আনন্দের অনুভূতি ওকে ঘিরে ধরল । আবীর ভেবেছিল অননিতা আসবে কিন্তু একেবারে আজকেই আসবে ও ভাবতেই পারে নি । একসময় আবীর অনুভব করল যে অননিতা কাঁদছে । -কাঁদছো কেন ? -কাঁদবো না তো হাসবো ? গাধার মত কথা বলবা না । আবির হাসলো । ফোপাতে ফোপাতেই বলল -তুমি এমন করে আমাকে কেন কষ্ট দিলে ? আমি কি ইচ্ছে করে ওসব বলেছিলাম । তুমিতো জানতে আমি ড্রাঙ্ক ছিলাম । আমার কথায় এতো রাগ করলে কেন ? কেন এভাবে আমাকে ছেড়ে চলে এলে ? আমার কথা একবারও মনে পড়ে নি ? আরো কতশত অভিযোগ ! আবীর কোন কথা বলে না । অননিতাকে আরো নিবির করে জড়িয়ে ধরে । ওর বুকের স্পন্দন দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চায় তোমাকে ছেড়ে আর কোন দিন যাবো না । দুরে ছিলাম কিন্তু মনটা তো তোমার কাছেই পড়ে ছিল । কতক্ষন ওরা একে ওপরকে জড়িয়ে ধরেছিল ওদের নিজেদের কোন সময় জ্ঞান ছিল না । সগির মিয়ার কথায় খ্যাল হল । -রাতে কি খাবেন স্যার ?
আমি বৃষ্টি দেখেছি নীলুর বৃষ্টি অনেক পছন্দ ছিল । বৃষ্টি হলে আর কোন কথা নাই । ওর মাথায় কি এক অদ্ভূদ চিন্তা ছিল যে বৃষ্টি হলে ওকে ভিজতেই হবে । কোন সময় জ্ঞান নাই । বৃষ্টি মানে ভিজতেই হবে । ইনফ্যাক্ট ওকে আমি প্রথম লক্ষ্য করি এই বৃষ্টিতে ভেজা নিয়েই । একদিন ক্লাস করছিলাম । ও আমার পরেই বসে ছিলাম । হঠাৎ আমার নাম ধরে ডাকল । -এই অপু ? এই ? এমনি চিনতাম ওকে । কিন্তু এর আগে কখনও কথা হয়নি ওর সাথে । -এই শোন না ! আমি একটু অবাক হলাম । একটু বিরক্তও । কোন দিন কথা বলি নি । প্রথম কথাতেই তুই । -কি ? -আমার বই আর খাতাটা একটু রাখতো ! আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নীলু বের হয়ে গেল । আমি সত্যি অবাক না হয়ে পারলাম না ! বাইরে ততক্ষনে ঝুম বৃষ্টি আরাম্ভ হয়েছে । একটু পর লক্ষ্য করলাম নীলু বাচ্চা কয়টা ছেলে মেয়েদের সাথে বৃষ্টির ভিজছে । বলতে গেলে নাচা নাচি করছে । এতো বড় একটা ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে যে এমন করে বৃষ্টিতে ভিজতে পারে আমার ধারনার বাইরে ছিল ।
উহু ! নিজের মনকে আবারও একটা ধমক দিলাম । আমি আবারও নীলুর কথা ভাবতে শুরু করেছি । সকালবেলাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে ওর কথা আর ভাববো না । কিন্তু দুপুর গড়াতে না গড়াতেই ওর কথা আবার ভাবতে শুরু করেছি । আসলে সব দোষ এই হতচ্ছাড়া বৃষ্টিটার । সেই দুপুর বেলা থেকে একভাবে ঝড়েই যাচ্ছে । আর আমার কেবল মনে হতে লাগল ঐ বৃষ্টিটা আমাকে মুখ ভেঙ্গিয়ে বলছে আমি তোমার খুব প্রিয় একজনের খুব প্রিয় ছিলাম । আমি চোখ ফিরিয়ে নেই । ঘরের সব জানালা বন্ধ করে দেই । আমি বৃষ্টি দেখবো না । ফুল ভলিউমে টিভি ছেড়ে দেই । বৃষ্টির শব্দও আমি শুনতে চাই না । আমি এমন কিছু করতে চাই না যা আমাকে নীলুকে মনে করিয়ে দেয় । আমি ওকে মনে করতে চাই না । কেন মনে করবো ওকে ? যে আমাকে একা রেখে চলে গেছে তার কথা আমি কেন মনে করবো ? আমি মনে করবো না । সোফার উপর বসতে ইচ্ছা হয় না । সবুজ কার্পেটার উপর শুয়ে পড়ি । নীলু খুব শখ করে এই কার্পেটটা কিনেছিল । নষ্ট হয়ে যাবে বলে বসার ঘরে এটা বিছায় নি । সোবার ঘরটাতে বিছিয়েছিল । প্রথম যেদিন কার্পেটটা পাড়ে নীলুর আনন্দ দেখে কে !! বাচ্চা মেয়ে দের মত খুশিতে ওর চোখমুখ আনন্দে ভরে ছিল । আমার হাত চেপে ধরে বলল -দেখো না কি সুন্দর লাগছে ! মনে হচ্ছে সবুজ একটা মাঠে চলে এসেছি । আমি এখন ভাবছি অন্য কথা । আমি তখন আসসোস করছি এতোগুলো টাকা বেড়িয়ে গেল বলে ! অবশ্য আফসোসের খুব বেশি কারন ছিল না । আমার নিজের টাকা না বাপের টাকা । তবুও নতুন সংসারে এখনও কতকিছু কেনা বাকি ! আগে ব্যাচেলার ছিলাম তাই কোন ব্যাপার ছিল না । -কই বল না কেমন ? -ভাল কিন্তু একটু বেশি বিলাশিতা হয়ে গেল না ? নীলু মুখ একটু মলিন হল ।
আরে দুর ! যত চাচ্ছি ওকে ভাববো না তত ওর ভাবনা চলে আসছে । আমি সবুজ কার্পেট থেকে বিছানায় উঠে এলাম । ওর কথা কিছুতেই ভাববো না । আমি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করি । ঘুমালে হয়তো ওর ভাবনা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবো ।
-কি করছ ? নীলুর কণ্ঠ । কিন্তু ওর কন্ঠ কিভাবে আসবে ? নিশ্চই আমার কল্পনা । -কিছু করছি না । নীলুর হাসির শব্দ শুনতে পেলাম । -সত্যি কিছু করছো না ? -না । তোমার সাথে কোন কথা নাই । তুমি চলে যাও । -বাব্ব বাহ আমার উপর রাগ করছ ? -হুম । রাগ করেছি । নীলু আবার হেসে উঠল । -হাসছো কেন ? হাসি মিশ্রিত কণ্ঠ নীলু বলল -তুমি আমার উপর রাগ করতেই পারবে না । সেই ক্ষমতা তোমার নেই । কোন জুটসই জবাব না পেয়ে বলল -তাহলে তুমি আমাকে ছেড়ে কেন চলে গেল ? -কই গেলাম ? এই তো আমি তোমার কাছে । তোমার সাথে কথা বলছি । -না তুমি বলছ না । তুমি আমার কল্পনা । -আচ্ছ ? তাই ? নীলু আবার হেসে উঠল । বলল -আচ্ছা তুমি যা বল তাই । এখন চল বাইরে খুব সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে । চল না একটু ভিজি ! চল না ! বৃষ্টির কথা উঠতেই আমি ভিজতে গেলাম । কিন্তু নীলুকে কোথাও দেখতে পেলাম । নাম ধরে ডাক দিলাম । কিন্তু ও কোন জবাব দিল না । ওর নাম নিতে নিতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল । পুরো ঘর কেমন অন্ধকারে ছেয়ে আছে । টিভি চলছিল । এখন বন্ধ । বাইরে এখনও বৃষ্টি পড়ছে তুমুল বেগে । আওয়াজ আসছে । কারেন্ট চলে গেছে বোধহয় । বাধ্য হয়েই জানালা খুলে দিলাম । বাইরে এখনও বৃষ্টি পড়ছে । আমার নীলুর পছন্দের বৃষ্টি !
ঐ দিন পর নীলু পরপর দুদিন ক্লাসে আসল না । তৃতীয় দিন একটা টিউটিরিয়াল ছিল । ঐ দিন নীলুকে আবার দেখলাম । কিন্তু চেহারার একি অবস্থা ? ও কাছে এসে ওর খাতা পত্র চাইল । দিতে গিয়ে বললাম - চেহারার একি অবস্থা ? শরীর খারাপ নাকি ? নীলু শুকনো মুখে বলল -একটু জ্বর । বই গুলো নিয়ে ও ঘুরতে যাবে ঠিক এমন সময় ও কেমন জানি দুলে উঠল । আমি না ধরলে হয়তো মাথা ঘুরে পরে যেত । ওর গায়ে তখন আকাশ পাতাল জ্বর । -একি তোমার গায়ে তো খুব জ্বর ! নীলু আবার শুকনো মুখে বলল -একটু জ্বর । আমাকে একটু বেঞ্চে বসিয়ে দিবে প্লিজ । -তোমার গায়ে খুব জ্বর । এখন বসতে হবে না । ডাক্তারের কাছে চল আগে । -এখন পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে । আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না । তুমি পরীক্ষা দাও । -আরে এরকম টিউটিরিয়াল আরো হাজারটা আসবে । আগে ডাক্তারের কাছে চল ।
ওকে একপ্রকার জোর করেই ক্যাম্পাসের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম । টিউটিরিয়াল দেওয়া হল না । ডাক্তারের কাছ থেকে যখন বের হয়েছি এখন ওর অবস্থা আরো খারাপ । কেমন যেন লাগছিল । ওকে এই অবস্থা ছেড়ে আসতে কেন জানি মনে চাচ্ছিল না । ও বলল -আমাকে একটু হলে রেখে আসবে ? -হুম । কোন হলে থাকো ? ও হলের নাম বলল । -তোমার রুম মেইট আছে এখন রুমে ? নীলু একটু হাসল । -আছে । অন্তত ১০০ আছে । -মানে কি ? -আমি গন রুমে থাকি । -ও মাই গড ! এ অবস্থায় তো তোমাকে গনরুমে রাখা যাবে না । ঢাকায় কোন আত্মীয় আছে তোমার ? -নাহ । -তাহলে ? -তাহলে কিছু না । আমাকে হলেই রেখে আসো । -না । তুমি আমার সাথে চল । -কোথায় ? -আমার বাসায় চল । নীলু আমার দিকে তাকাল । কি যেন ভাবল ? তারপর বলল -তোমার বাসায় সমস্যায় হবে না ? মানে আমি একটা মেয়ে ! -কোন সমস্যা নাই । আমি ফ্লাট ভাড়া করে থাকি । ও আর কথা বলল না । অবশ্য ওর সে অবস্থা ছিলও না । নীলুকে বাসায় নিয়ে আসলাম । মোটামুটি পাঁচ দিন ওর অবস্থা বেশ খারাপ ছিল । একবার ভাবলাম হাসপাতালে নিয়ে যাই । আবারও ডাক্তার ডেকে আনলাম । পাঁচদিন পর ওর জ্বর ছেড়ে গেল । ঐ দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি নীলু রান্না ঘরে রুটি বানাচ্ছে । আমি অবাক হয়ে বললাম -কি করছ তুমি ? নীলু খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল -রুটি বানাচ্ছি । দেখছ না ? -দেখতে তো পাচ্ছি । কিন্তু কেন করছ ? -আশ্চর্য মানুষ রুটি কেন বানায় ? খাওয়ার জন্য ! -আরে বাবা তুমি কেন করছ ? তোমার শরীর খারাপ । তোমার বিশ্রাম নেওয়ার দরকার । আর কাজ করার জন্য বুয়া তো আছে । একটু পরই চলে আসবে । নীলু হাসল । -অনেক বিশ্রাম করেছি । আর কত ? তাছাড়া জ্বর নেই । আমি খুব স্বাভাবিক ভাবে ওর কপালে হাত দিলাম জ্বর দেখার জন্য । আসলেই জ্বর নেই । ওর কপাল থেকে হাত সরিয়ে নেবার সময় ওর চোখে চোখ পড়ল । ঠিক তখনই আমার মনের মধ্যে কেমন জানি একটা অস্বস্তি হল । আমি কিভাবে এতো সহজে ওর গায়ে হাত দিয়ে ফেল্লাম ? এই পাঁচ দিনে তো কতবার ওর জ্বর মেপেছি, একবারও এই অস্বস্তিটাতো আসে নি ! তাহলে এমন কেন অস্বস্তি লাগছিল ? আমার জানা নেই । ওকে ওভাবে রুটি বানানো অবস্থায় দেখে আমার মনে আরো অদ্ভুদ একটা অনুভূতি হল । নাস্তা খাওয়ার সময় অনেক কথা হল ওর সাথে । বলা চলে ওখান থেকে আমাদের মেলামেশা শুরু হল । তারপর থেকে ওর সাথে অনেক সময় কাটাতে লাগলাম । আমরা সবকিছু শেয়ার করতাম ।
বৃষ্টির বেগ মনে হচ্ছে বেড়েছে । এরকম বৃষ্টি হলে তো কথাই নাই । ওকে কিছুতেই ধরে রাখার উপায় ছিল না । বৃষ্টিতে ও ভিজবেই । আমি জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেই । বৃষ্টির ফোটা আমার হাতে পড়তে লাগল । -এভাবে ভিজলে কি হয় ? নীলুর কথা যেন আবার শুনতে পেলাম । -কিভাবে ভিজবো ? -তুমি মনে হচ্ছে জানো না ? মনে নেই এই ছাদটাতে আমরা একবার বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম !
আমার এই বাসাটা একে বারে ফ্লাট বললে ভুল হবে । তিন ইউনিটের বাড়িতে বাড়িওয়ালা কেবল এক ইউনিট কোন রকম করে ফেলে রেখেছে । পুরো ছাদটাই বলতে গেলে ফাকা পরে আছে । নীলুর এই ফাকা ছাদটাও অনেক পছন্দ ছিল । ও প্রায়ই আসতো । বাচ্চা মেয়েদের মত ছাদে উপর লাফালাফি করতো । একা একা এক্কা দোক্কা খেলতো । আমি হাসতাম কেবল । ঐ দিন সকালবেলা আমার বাসায় এসে হাজির । কাঁদে ছোট একটা ব্যাগ । আমি জিজ্ঞেস করলাম -ব্যাগে কি ? ও বলল -শাড়ি । আজ খুব বৃষ্টি হবে । শাড়ি পরে বৃষ্টিতে ভিজবো আজ । কেমন যেন একটু অন্য রকম লাগছিল ওকে । বুয়া আসলেও ওকে বিদায় করে দিল । দুপুরের রান্না ও নিজেই করল । দুপুরের দিকেই বৃষ্টি আরাম্ভ হল । আমি জানালার পাশে দাড়িয়ে বৃষ্টি দেখছি এমন সময় নীলু এসে হাজির । ওকে দেখে একটু অবাক হলাম । এর আগে কখনও ওকে শাড়িতে দেখি নি । কালো ব্লাউজের সাথে কালো শাড়ি আর কপালে কালো বড় একটা টিপ । আমি খানিকটা সময় ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম এক ভাবেই । নীলু একটা কালো পাঞ্জাবী আমার দিকে এগিয়ে বলল -নাও এটা পর । -কার এটা ? -তোমার জন্য কিনেছি । নাও জলদি পরো এখন । আজ তোমার সাথে আমি বৃষ্টিতে ভিজবো । কালো পাঞ্জাবী পরে বৃষ্টি নেমে পড়লাম । বৃষ্টির ফোটা গুলো কেমন সিরসরে অনুভূতি জাগাচ্ছিল মনে । কালো শাড়ি পরা নীলু আমার আগে আগে হাটছিল । একটা সময় আমার কাছে এসে আমার হাতটা ধরল । আমার দিকে তাকাল গভীর ভাবে ! নীলুর ঐ গভীর দৃষ্টিতে কি ছিল জানি না আমার পুরো পৃথিবীটা যেন এলো মেলো হয়ে গেল । সেদিন ঠিক কি করেছিলাম আমার আজও ঠিক মনে পড়ে না । কি এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম । কেবল এই টুকু মনে আছে ওকে খুব গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরেছিলাম । আর পাগলের চুম খেয়েছিল ওকে ! বৃষ্টির জলে যেন দুজন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলাম ।
-কি হল ভিজবে না বৃষ্টিতে ? -না ভিজবো না । -কেন ? চল না একটু বৃষ্টিতে ভিজি ! -তুমি ভিজো । -তুমি না ভিজলে আমি কিভাবে ভিজি ? -সেদিন কিভাবে ভিজেছিলে ? হঠাৎ আমার কন্ঠস্বর তীব্র হয়ে ওঠে । -কেন সেদিন ভিজেছিলে ? আমি আবার জানতে চাই চিৎকার করে । কোন জবাব আসে না ।
নীলুকে তার কিছুদিন পরেই বিয়ে করে ফেলি । ওকে আর কিছু ভাল লাগতো না তখন । একটা পলক না দেখলে কেমন জানি অস্থির লাগতো । বিয়ের পর আমাদের জীবনটা আরো সুন্দর হয়ে ওঠে । দুজন দুজনকে একটা পলকের জন্য চোখের আড়াল করতাম না । একসাথে ভার্সিটি যেতাম একসাথে আসতাম । একসাথে খেতাম , একই প্লেটে খেতাম , গোসল করতাম একসাথে বিকেল হলে ওর সাথে ছাদে ছোটা ছুটি করতাম । ওর ছেলেমানুষী যেন আরো বেড়ে গেল । আগে বৃষ্টি হলেতো কেবল ও একা ভেজার জন্য লাফাতো তখন আমাকেও ভিজতে হত ওর সাথে । বৃষ্টির প্রতি এমন পাগলামো দেখে মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম । বিরক্ত হওয়ার প্রধান কারন টা হল প্রত্যেকবার বৃষ্টি ভেজার পরই ওর জ্বর আসতো । মাঝে মাঝে তো জ্বর গায়ে নিয়েও বৃষ্টিতে নেমে পড়ত । তখন খুব চিৎকার চেচামেচি করতাম । কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হত না । ঐ দিন ঠিক একই কাজটা করেছিল । নীলুর গায়ে আগে থেকেই দুদিনের জ্বর ছিল । রাত তখন বারটা কি সাড়ে বারটা হবে । সারাদিন ক্লাস নিয়ে বেশ ব্যস্ত ছিলাম । বিকেল বেলা আবার নীলুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে ছিলাম । ডাক্তার বৃষ্টিতে ভিজতে সাফ মানা করে দিয়েছে । তবুও নীলু আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলল -এই বাইরে না খুব সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে । চল না একটু বৃষ্টিতে ভিজি ! ওকে ধমক দিলাম । ডাক্তার কি বলেছে মনে করিয়ে দিলাম । চুপচাপ ঘুমাতে বলে নিজেও ঘুমিয়ে পড়লাম । সকাল বেলা বাথরুমে ভেজা কাপড় দেখে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম । তারমানে রাতের বেলা ও আমাকে না জানিয়েই বৃষ্টিতে ভিজেছে । মেজাজটা খারাপ হল । নীলুকে বকার জন্য শোবার ঘরে গিয়ে দেখি নীলু প্রায় অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পরে আছে । ওর গায়ে আকাশ পাতাল জ্বর । কি করবো কিছুই বুজতে পারছিলাম না । জ্বল পট্টি দিয়েও কাজ হচ্ছিল না । জ্বর কমছিল না কিছুতেই । উপায় না দেখে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম । স্ট্রাচারে যখন ওকে আইসিইউতে নিয়ে যাচ্ছিলাম তখন অল্প ক্ষনের জন্য ওর হুস ফিরেছিল । আমি তখন ওর হাত ধরা । ও ফিসফিস করে বলল -আমার উপর রাগ রেখো না কেমন ! তোমার কথা শুনিনি বলে আমার উপর রাগ রেখো না । -তোমার উপর কখনও রাগ করেছি আমি বল ? -তুমি ভাল থেকো । আমি আর কথা বলতে পারলাম না । নার্সরা ওকে আইসিইউ এর মধ্যে নিয়ে গেল । আমি শেষ বারের মত ওর চোখে জল দেখতে পেলাম ।
- কই চল । বৃষ্টি শেষ হয়ে যাবে তো ? -আমি ভিজবো না । -প্লিজ চল না ! আমি চুপ করে থাকি । কেন জানি আমার কান্না আসে ! -কই চুপ করে আছো কেন ? চল ! ঐ কালো পাঞ্জাবীটা পরো । কাবাডের বাম পাশের ড্রায়ারে আছে । ওকে কথা দিয়েছিলাম ওর উপর রাগ করে থাকতে পারি না । ও ভাল থাকতে বলেছিল কিন্তু আমি ভালও থাকতে পারছি না ওকে ছাড়া । আমি কালো পাঞ্জাবীটা পরে নিই । বৃষ্টির ফোটা আমার মনে আজও কেমন একটা শিহরন জাগায় ! যেন ও এখনও আমার পাশে বৃষ্টিতে ভিজছে । ওর খুব পছন্দের বৃষ্টি ।
সুন্দর সেই ভালবাসার দিনটির জন্য অপেক্ষা কথাটা বলেই শ্রাবণীর মনে হল কি করলাম ! ও তো এখন মন খারাপ করবে । এমন ছোট ছোট কথাতে ছেলেটা মন খারাপ করে ! কিন্তু ছেলেটা কে তো দোষও দেওয়া যায় না । ও তো আর অন্য কেউ না । ওর একটু রুক্ষ আচরনে তো মন খারাপ হবেই । এখন কি করা যায় । শ্রাবণী খুব ভাল করে জানে এখন যদি ও এভাবেই ফোন টা রেখে দেয় তাহলে অপু সারারাত মন খারাপ করে থাকবে । কথার শুরুতে বলেছিল যে এখনও ভাত খাওয়া হয় নি , ফোন রেখে দিলে ভাত না খাওয়ারও সম্ভাবনা আছে । অপুর এই এক দোষ । যদি শ্রাবণীর কোন কথাতে বা আচরনে ও কষ্ট পায় ওকে কিছু বলবে না । নিজেকে কষ্ট দেবে । শ্রাবণী খুব বিরক্ত হয় ওর এই আচরনে । বলে 'তুমি এমনটা কেন কর । আমি যখন তোমাকে কষ্ট দেই তুমি আমাকে কষ্ট দিতে পার না?? নিজেকে এভাবে কেন কষ্ট কেন দাও ?' অপু হাসে । বলে 'তুমি আমার একটা মাত্র টিয়াপাখি ।তোমাকে কিভাবে কষ্ট দেই বল?' শ্রাবণীর চোখে পানি এসে যায় । এই কথা গুলো খুব ভাল লাগে । তখন নিজের উপর খুব রাগ । এমন একটা মানুষকে কিভাবে ও কষ্ট দেয়? মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এমন টা আর করবে না । কিন্তু তবুও হয়ে যায় । ওর রাগটা এতো বেশি ! যখন মেজাজ খারাপ থাকে তখন কাকে যে কি বলে হুশ থাকে না । শ্রাবণী বলল -কি হল চুপ করে গেলা কেন ? কথা বল । -তোমার যখন কথা বলতে ভাল লাগছে না তখন ফোন রেখে দেই ? -ভাল করে বল । -ভাল করেই তো বলছি । আম কি কখনও তোমার সাথে খারাপ করে কথা বলেছি ? শ্রাবণীর খুব মায়া লাগে । কথাটা খুব সত্যি । শ্রাবণী অপুর সাথে যত খারাপ ব্যবাহরই করুক না কেন অপু কখনও ওর সাথে একটা উচু স্বরে কথা বলে না । শ্রাবণী বলল -আমি ঐ খারাপের কথা বলি নি । ভাল করে বল মানে বুঝিয়েছি একটু হেসে বল । প্রতিদিন ফোন রাখার সময় যেমন করে বল সেভাবে বল । -ওভাবেই তো বলছি । -না ওভাবে বলছ না । হেসে বল । শ্রাবণী ধমক দিয়ে ওঠে । তারপর একটু নরম স্বরে বলল -প্লিজ একটু হেসে বল । আমি জানি এখন যদি তুমি মন খারাপ করে ফোন রেখে দাও সারারাত তোমার মন খারাপ থাকবে । কালকেও তোমার মন খারাপ থাকবে । বল এটা কি আমার ভাল লাগবে ? -আচ্ছা বাবা আমি মন খারাপ করবো না । কথা দিলাম । শ্রাবণীর একটু ভাল লাগে । অপু যখন ওকে কোন কথা দেয় তা ও সবসময় রাখে । শ্রাবণী বলল -তুমি বাচ্চা ছেলেদের মত কেন অল্পতে কষ্ট পাও বলতো ? মানুষের সব দিন কি সমান যায় । একটু তো উনিষ-বিশ হয়েই যা্য় ! এতো মন খারাপ করলে কি চলে ? আজ সেই সকাল বেলা বাসা থেকে বের হয়েছি । মাত্র আসলাম । সারাদিন ক্লাস ট্রেনিং স্যারদের বকবকানি এসব করে যখন বযসায় আসি মন মেজাজ কি ঠিক ঠাকে বল ? -আমি তো বুঝি । কিন্তু কি করব বল? তোমার দিক থেকে আসা একটু খানি ভালবাসা আামকে যে কি পরিমান আনন্দ দেয় তোমাকে বলে বলে বোঝাতে পারব না । ঠিক তেমনি একটু কঠিন কথা খুব ক|ষ্ট দেয় । শ্রাবণীর নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হয় । যত যাই কিছু হক কই অপুতো কখনও ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করে না । তাহলে ও কেন করে ? কেন এমন টা করে । অপু বলল -জানো আমার কি মনে হয় ? -কি মনে হয়? -না শুধু মনে হয় না এটা আমার বিশ্বাস যে এমন একটা দিন আসবে যে দিন তুমি চাইলেও আমার সাথে খরাপ ব্যবহার করতে পাবে না । শুধু আমাকে ভালই বাসবে । আমি সেই সুন্দর ভালবাসার দিনটার জন্য অপেক্ষা করি । শ্রাবণী লক্ষ্য করল আপনাআপনি ওর চোখে পানি চলে এসেছে । এমন ভাবে কেন অপু ওকে ভালবাসে ! কেন ? মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে অপুকে আর কখনও কষ্ট দেবে না । ওর সাথে আর একটুও খারাপ ব্যবহার করবে না ।
ঐ বিষন্ন মুখে হাসি আমি ফোটাবো.. ঈশিতা প্রথমে বুঝতেই পারল না কি হচ্ছে । ওর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল । ও আসলে ভাবতেই পারে নি যে আমি এই রকম একটা কাজ করবো বা করতে পারি । যখন লিফটের দরজা দিয়ে বের হলাম পিছন ফিরে চাইলাম । এতো দিন পর এই প্রথম ওর চোখে আমি বাষন্নতার জায়গায় এক টুকরো বিশ্ময় দেখতে পেলাম । ঈশিতা এতোটাই বিশ্মিত হয়েছে যে হয়তো ও ভুলেই গেছে এই ফ্লোরেই ওকে নামতে হবে । আস্তে করে লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল । আমি আমার কেবিনে ঢুকে পরলাম । প্রথম যে দিন আমি এই অফিসে যোগদিই সেই দিনই ঈশিতার প্রতি আমি ইন্টারেস্টেড হয়ে উঠি । একনম্বর কারন হল আমার পোষ্টটা টা ঈশিতার আন্ডারে । ম্যানেজার সাহেব যখন আমাকে ঈশিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল তখন আমার মনে হল এই টুকু একটা পিচ্চি মেয়ের আন্ডারে আমি কাজ করবো ? এই পিচ্চি মেয়েটা আমার বস ? দ্বিতীয় কারনটা হল পিচ্চি হলেও মেয়েটা অসম্ভব গম্ভীর । প্রয়োজনের একটাও বেশি কথা বলে না । আমি ভেবে পেলাম না এই টুকু বয়েসে মেয়েটা এতো গম্ভীর্য পেলো কোথা থেকে ? প্রথম দিনে এই কথাটাই কেবল আমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল । এমনটা কেন হবে ! আমার বস হওয়ার সুবাধে ঈশিতার সাথে আমার কথা বলার অনেক স্কোপই তৈরি হতে লাগল । কিন্তু ঈশিতা সেই আগের মতই । প্রয়োজনের একটাও বেশি কথা মেয়েটা বলে না । কয়দিন পরই এক কলিগের কাছ থেকে মেয়েটার এমন গাম্ভীর্যের কারন জানতে পারলাম । জানতে পেরে মোটামুটি একটা সক খেলাম । মেয়েটা বিবাহিত । ও মাই গড ! এটু টুকু পিচ্চি মেয়ে বিবাহিত । আরো জানতে পারলাম মেয়েটার খুব সুখী একটা সংসার ছিল । আগে সবার সাথে খুব মেলামেশা করত ।সবার সাথে কথা বলত , হাসতো । খুব প্রাণ চঞ্চল একটা মেয়ে ছিল । কিন্তু মাস ছয়েক আগে একটা দুর্ঘটনায় মেয়েটার স্বামীটা মারা যায় । তারপর থেকেই মেয়েটা এমন চুপচাপ হয়ে যায় । তারপর থেকেই মেয়েটার উপর আমার আকর্ষন আরো বেড়ে যায় । আমি উপায় খুজতে শুরু করলাম কিভাবে ঈশিতাকে আবার স্বাভাবিক করা যায় ! কিভাবে মেয়েটার মুখে হাসি ফোটানো যায় ! এসব ভাবতে ভাবতে একটা সময় আমি লক্ষ্য করলাম আমি সারাটা সময় কেবল ঈশিতার কথাই ভাবছি । যতক্ষন অফিসে থাকি ততক্ষন কেবল ওর আসেপাশে থাকতে ইচ্ছা করে । কোন না কোন কাজের বাহনায় আমি ঈশিতার কেবিনে যেতে লাগলাম । ওর সাথে একটু বাড়তি কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলাম । খুব যে বেশি লাভ হল তা বলব না , কিন্তু আমি নাছড়বান্দা । আমি চেষ্টা করতেই থাকলাম । কিন্তু সব ভাল কাজে বাধাতো আসবেই । কয়দিন আগে আমার হাতে আমার প্রমোশন লেটার এসে হাজির হল । তাতে বলা হয়েছে আমাকে সিনিয়র অফিসার পদে অধিস্থিত করা হয়েছে । তারমানে ঈশিতার সমান পদ । কিন্তু সমস্যা হল আমার আমার পোষ্টিং হল অন্য শাখায় । কিন্তু আমি ঈশিতাকে ছেড়ে কিভাবে যাবো ? মোটেই যাবো না । প্রমোশনের খ্যাতা পুড়ি আমি । লাগবে না আমার প্রমোশন । চুপচাপ বসের কেবিনে গেলাম । গিয়ে বললাম আমার প্রোমোশনের দরকার নাই । আমাকে যেন আগের পদেই রাখা হয় । বস শুধু অবাক হল না যেন আকাশ থেকে পড়ল তাও আবার সাত আসমানের উপর থেকে । কিন্তু আমার কাজ করার রেকর্ড মোটামুটি ভাল । তাই বস আমার কথা রাখলেন । সেই দিনই ঈশিতা আমার সাথে প্রথম কথা বলল । মানে কাজের বাইরে কোন কথা বলল । ওর কেবিনে গেছিলাম একটা কাজে । কাজ শেষে কেবিন ছেড়ে যাবো ঠিক এমন সময় ও পিছন থেকে ডাকল । -অপু সাহেব একটু শুনুন । -জ্বি বলুন ? -আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি ? যদি কিছু না মনে করেন । -হ্যা অবশ্যই । ঈশিতা খানিকটা ইতস্তত করে বলল -আচ্ছা আপনি প্রমোশনটা রিফিউজ কেন করলেন ? আমি হাসলাম । বললাম -আসলে সাভারে পোষ্টিং দিচ্ছিল তো তাই ইচ্ছা করলো না যেতে । ঈশিতা আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল । কি বিষন্ন সেই দৃষ্টি ! তারপর বলল -আপনি যেটা চাচ্ছেন সেটা কখনও সম্ভব না । কখনও না । আরে মেয়েটা বলে কি ? তার মানে আমার আচরন ওকে কিছুটা ভাবিয়েছে । ও কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছে । আমি একটু হাসলাম । বললাম -যদি লক্ষ্য থাকে অটুত দেখা হবে বিজয়ে । -মানে ? -কোন মানে নেই । আমি আসি । আমি আবার হাসলাম । কেবিন থেকে বেরনোর আগে আমি আবার ঘুরে দাড়ালাম । বললাম -ঈশিতা ! ঈশিতা মুখ তুলে চাইল । -আমি আপনার মুখে আমি হাসি ফোটাবোই । আর দাড়ালাম না । ঘুরে চলে এলাম । তারপর আমি ওর আশেপালে থাকি । প্রত্যেকটা কাজে ওকে জানান দেওয়ার চেষ্টা করি যে আমি আছি তোমার আসেপাশে । যতক্ষন না তুমি হাসছো ততক্ষন আমি নড়ছি না । কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না । ঈশিতা ঠিক আগের মতই রয়ে গেল । আগের মতই চুপচাপ আগের মতই বিষন্ন । তবে একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করতাম আমার উপস্থিতিতে ওর চেহারার মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন আনতো । তবে এটা সিওর বুঝতাম না যে ওটা অস্বস্তি ছিল নাকি আনন্দ । এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল । ঈশিতার সাথে দেখা হচ্ছিল কথা হচ্ছিল কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না । মেয়েটার বিষন্ন চেহারায় কিছুতেই পরিবর্তন আনতে পারছিলাম না । তারপর আজকের দিন এল । অফিসে আসতে আজ একটু দেরি হয়ে গেছিল । লিফটের সামনে এসে দেখি ঈশিতা দাড়িয়ে আছে । আমাকে দেখেও যেন দেখল না । আরে এটা কেমন কথা হল ? আমরা একসাথে কাজ করি দুএকটা কথাতো বলা যায় ! আমি খানিকটা হেসে বলল - গুড মর্নিং ও যথারীতি আমার দিকে না তাকিয়েই বলল -গুড মর্নিং । লিফট চলে এল । মাত্র দুজনই । আর কেউ উঠল না । আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম যেন আর কেউ না ওঠে । দরজা বন্ধ হতেই ঈশিতাকে বললাম -মানুষের সাথে এরকম ব্যবহার করা কিন্তু ঠিক না । -আপনি কি আমাকে বলছেন ? -না আপনাকে কেন বলব ? আমার পাশের ফ্লাটে একটা পেট মোটা লোক থাকে সে সবসময় মানুষকে খুব হার্ট করে । তাকে বললাম কথাটা । ঈশিতা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে । আমি আবার বললাম -এটা কি ধরনের প্রশ্ন হল ? অবশ্যই আমি আপনাকেই বলতেছি । -অপু সাহেব আমি এমনই । -কিন্তু আপনিতো এমনটা ছিলেন না । -কেমন ছিলাম এটা প্রশ্ন না এখন কেমন আছি এটাই প্রশ্ন । -আমার খুব খারাপ লাগে আপনার এরকমটা দেখে । আপনি কি পরিবর্তন হতে পারেন না ? নতুন করে জীবন শুরু করা কি যায় না ? এবার ঈশিতা খানিকটা কঠিন গলায় বলল -দেখুন আপনার কি ভাল লাগে না লাগে তাতে আমার কিছু যায় আসে না ঠিক আছে । আপনার সাথে কথা বলতে ভাল লাগছে না । কি ? মেজাজটা খানিকটা খারাপ হল । এই মেয়েটার কথা ভেবেই আমার সারাটা দিন যায় । আমার কেবল এই চেষ্টা থাকে কিভাবে এর মুখে হাসি ফোটাবো আর এই মেয়ে কিনা আমাকে গোনার মধ্যেই নেই নেয় । আমি কি জলের টানে ভেসে এসেছি । ঈশিতার মুখোমুখি গিয়ে দাড়াই । ও কিছু বলার আগেই ওর হাত দুটো চেপে ধরলাম । বললাম -এই মেয়ে তোমার প্রবলেম কি ? আমার সাথে এমন কেন কর তুমি ? আমার তখন রাগে শরীর কাঁপছে । নিজের মধ্যে নেই আমি । কি করছি কি বলছি কিছুই ঠিক নেই । তোমাকে আজ আমি মজা দেখাচ্ছি । বলেই ওকে চেপে ধরে চুম খেলাম ওর ঠোটে । বেশ লম্বা করেই । যখন হুশ হল ততক্ষনে লিফটের দরজা খুলে গেছে । ভাগ্য ভাল যে দরজার বাইরে কেউ ছিল না । আমি লিফট থেকে বের হয়ে এলাম । যথন পিছনে ফিরে তাকালাম লিফটের দরজাটা বন্ধ হচ্ছে । আর প্রথম বারের মত ঈশিতার চেহারায় বিষন্নতার জায়গায় আমি বিশ্ময় দেখতে পেলাম ।
কাজ টাজ করছিলাম । কিন্তু মনটা ঐ দিকেই পড়ে ছিল । একটু দুষ্চিন্তাও হচ্ছিল । না জানি ঈশিতা কি একশন নেয় । তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল ও কাউকে কিছু বলবে না । সারা দিনে একবারও ঈশিতার কেবিনে যাই নি । পরদিনও গেলাম না । কিন্তু পরদিন অফিস ছুটি হবার একটু আগে পিয়ন এসে একটা চিরকুট দিয়ে গেল । বলল ঈশিতা দিয়েছে । চিরকুট টা খুলে দেখলাম অপেক্ষা করবেন প্লিজ ।
প্রথমে ভেবেছিলাম ঈশিতা হয়তো খুব ঝাড়ি মারবে । কিন্তু ওকে বেশ নরম দেখাল । আর সব থেকে বড় কথা হল ওর চেহারায় বিষন্ন ভাবটা তুলনা মূলক ভাবে কম । অফিসের সামনের একটা রেস্টুরেন্টে বসলাম আমরা । সত্যি বলছি আজ ঈশিতাকে দেখতে খানিকটা অন্য রকম লাগছে । আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আজ ঈশিতা হাসবে । আমার এতো দিনের চেষ্টা আজ সফল হবে । আমি আগে মুখ খুললাম, বললাম -তোমাকে সুন্দর লাগছে । একেবারে আপনি থেকে তুমি । হাহাহা !!! -এই কথা কেন বললেন ? -কারন আজ তোমার চেহারায় বিষন্নতাটা কম । একটু আছে তবে আমার বিশ্বাস এখন আমার সাথে কথা বলার পর তাও থাকবে না । -আপনার বিশ্বাসে সমস্যা আছে । আপনি যা ভাবছেন তার কিছুই হবে না । আমি শুধু একটা কথা জানতে আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছি । -তাও তো নিয়ে এসেছ ! বল তোমার কথা । -আপনি কেন করলেন কাজটা ? -কোন কাজটা বল তো ? -শুনুন ঢং করবেন না । আপনি খুব ভাল করেই জানেন কোন কাজটা ! সরাসরি ঈশিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম -তুমি কি শুধু এই কথাটা জানার জন্যই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ ? ঈশিতা চট করেই উত্তর দিল না । কিছুক্ষন পর মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দিল যে ওর আরো কিছু বলার আছে । -আগে তোমার কথা শুনি । খানিকটা সময় চুপ করে থেকে ঈশিতা বলল -আপনি যে কাজটা করেছেন ঠিক এমনই একটা ঘটনা আমার জীবনে এর আগেও ঘটেছে । -মানে ? -মানে সজিব । আমার হাজবেন্ড । বিয়ের আগে ও আমাদের পাশে ফ্লাটেই থাকতো । একদিন লিফটের মধ্যে আপনার মতই কথা বলতে বলতে আমাকে চেপে ধরে কিস করেছিল । ওর খুব রাগ করার চেষ্টা করেছিলাম । কিন্তু পারি নি । ঐ ছেলেটা কিভাবে যে আমার মনটা নিজের করে নিল বুঝতেই পারলাম না । আমার সব কিছুই যেন ওর ছিল । আমার সব আবেগ অনুভূতি ভালবাসা সব কিছুই ওর ছিল । ও চলে যাবার পর ওর সাথে সাথে এ সব কিছুও হারিয়ে গিয়েছিল । কিন্তু ... -কিন্তু কি ? -আজ আমি আপনার উপর রাগ করতে পারছি না । আপনি যে কাজটা করেছেন অভিয়াসলি আপনার উপর আমার রাগ করা উচিত্ কিন্তু আমি রাগ করতে পারছি না । আমি কাল সারাটা রাত কেবল আপনার কথা ভেবেছি । আপনি এতো দিন যে আমার পিছনে লেঘেছিলেন তার প্রতিটা কথা আমি কাল রাতে ভেবেছি । খানিকটা অবাক হয়েছে । তারপর একটু ইতস্তত করে বলল -খানিকটা খুশিও হয়েছি । খুশি ? ওমাইগড ! এই মেয়েটা কি বলছে ! এই সুযোগ । আমার যা বলার তা বলেই ফেলতে হবে । আমি ওর হাত ধরলাম । ঈশিতা অন্য দিকে তাকিয়ে থাকল । আমি বললাম -আমার চেহারাটা তো এতোটা খারাপ না যে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে । জানো কলেজ লাইফে আমার পিছনে কত গুলো মেয়ে ঘুরতো ! ঈশিতা মুখে একটু যেন হাসির আভা দেথতে পেলাম । তবে ওর চেহারার বিষন্নতা পুরোপুরি কেটে গেছে । ওকে বললাম -জীবনটাকে সব সময় সচল রাখতে হয় । এটাই জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট । কিন্তু তুমি তোমার জীবনটাকে থামিয়ে রেখেছ । একটা জায়গায় আটকে রেখেছ । এতে যেমন তুমি কষ্ট পাচ্ছ তোমার আসেপাশের মানুষ গুলোও কষ্ট পাচ্ছে । এটা কি ঠিক হচ্ছে বল ? ঈশিতা আবার মাথা নাড়াল । -তাহলে কেন এমন করছ ? তোমাকে একটা গল্প বলি । একটা ছেলে একটা মেয়ে অনেক ভালবাসত । কিন্তু একদিন মেয়েটা মারা যায় । এতে ছেলেটা খুব বেশি কষ্ট পায় । সারা দিন কান্না কাটি করে মন খারাপ করে থাকে । একদিন ছেলেটা মেয়েটাকে স্বপ্নে দেখলো । স্বপ্নে দেখলো যে মেয়েটার চারিপাশে খুব চমত্কার পরিবেশ । গাছগাছালি রংবেরংয়ের জিনিস পত্রে ভরপুর । কিন্তু কেবল মেয়েটা যেখানে আছে তার আসেপাশে সবকিছু কেমন যেন প্রানহীন বিবর্ণ । ছেলেটা আরো লক্ষ্য করল আসেপাশের সবার ঘরে আলো জ্বললেও মেয়েটার ঘরে কোন আলো জ্বলছে না । ছেলেটা জানতে চাইল তোমার এমন কেন অবস্থা । মেয়েটা বলল আমার এ অবস্থার জন্য তুমি দায়ী । ছেলেটা খুব অবাক হল । বলল কেন ? মেয়েটা বলল তুমি যে আমার জন্য সারাদিন কান্নাকাটি কর তোমার সেই চোখের জল এসে আমার ঘরের মোমবাতি নিভিয়ে দিয়ে যায় । এই জন্য আমাকে অন্ধকারে থাকতে হয় । আর তুমি যে মন খারাপ করে থাকো তোমার সেই বিষন্নতা আমার চারিপাশটাকে প্রান হীন করে তোলে । ঈশিতা বলল -এ গল্প আপনি কোথা থেকে শুনেছেন ? -কোথা থেকে শুনেছি ইম্পর্টেন্ট না । মুল থিমটা ইম্পর্টেন্ট । তুমি কিন্তু তোমার ভালবাসার মানুষটাকেও কষ্ট দিচ্ছ । যে ঐ উপরে আছে তোমাকে দেখছে তাকে কষ্ট দিচ্ছ আর যে তোমার কাছে আছে তাকেও । ঈশিতা কোন কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল । -আচ্ছা আমি তাহলে কালকেই সাভারে পোষ্টিং নিয়ে নিচ্ছি । ঠিক আছে ? ঈশিতা এবার অবাক হল । -কেন ? -আরে আশ্চর্য আমার বউ যদি আমার উপরে জব করে তাহলে লোকে কি বলবে ? ঘরেও আমি বউয়ের কথা শুনবো আবার অফিসেও তার কথা শুনবো তাহলে কিভাবে হয় ? ঈশিতা আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল । এই প্রথম ওকে আমি হাসতে দেখলাম । হাসলে ওকে কি চমত্কারই না লাগে । হাসতে হাসতেই বলল -আমার বয়েই গেছে তোমাকে বিয়ে করতে ! কত কিছু ভাবো না তুমি । ঠিক মত কথা শুরু করতে পারলাম না উনি বিয়ে পর্যন্ত চলে গেছে । বসে বসে স্বপ্নই দেখো তুমি । আমি কোন কথাই বলি না । কেবল ওর হাসি ভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকি । মনে হয় আমি জয়ী হয়েছি ।